
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে চরম অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও আধুনিক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি, যা ২০১৮ সালের জরিপে ছিল ১১৪টি।
সংখ্যাটি কিছুটা বাড়লেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে সুন্দরবনের পানিতে লবণাক্ততা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিঠাপানির এই তীব্র সংকটের ফলে বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়াসহ নানা চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি বনের সীমানা সংকোচন এবং নদী-খালে অবৈধ ও অবাধ ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বিকট শব্দে বাঘের শান্ত ও নির্জন বিচরণক্ষেত্র মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সংঘবদ্ধ চোরা শিকারি চক্রের দৌরাত্ম্য, যারা দুর্গম বনের সুযোগ নিয়ে বাঘের চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গপ্রতঙ্গ পাচারের কুচক্রী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে হরিণসহ বাঘের প্রধান শিকারের প্রাচুর্য হ্রাস পাওয়া এবং বনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই বাঘ খাবারের সন্ধানে উপকূলীয় লোকালয়ে চলে আসছে, যা মানব-বাঘ দ্বন্দকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা এই রাজকীয় প্রাণীটি হারিয়ে গেলে পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসেবে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলের কোটি মানুষকে রক্ষা করে আসছে, আর এই বনকে টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি হলো বাঘ। বাঘ না থাকলে বনে মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ লাগামহীন হয়ে পড়বে এবং পুরো উপকূলীয় অঞ্চল এক মহাসংকটের মুখোমুখি হবে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে ২৯ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ হিসেবে ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা ও সচেতনতা তৈরি করা। সাতক্ষীরা পশ্চিম বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক জানিয়েছেন, সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ বাঘ ও এর স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংখ্যা বৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদেরও একযোগে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রথাগত পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চোরা শিকারিদের দমনে জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে স্মার্ট পেট্রোলিং, আধুনিক ড্রোন ট্র্যাপিং বাড়িয়ে পুরো বনে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি নিশ্চিত করা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে বাঘ রক্ষায় ‘কমিউনিটি টহল দল’ গঠনে উৎসাহিত করা জরুরি। সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করা কেবল বনের ভেতরের কাজ নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার লড়াই; তাই এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো কেবল গল্পেই সুন্দরবনের রাজার গর্জন শুনবে।