
আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভারকে ঘিরে অ্যাকাউন্ট কারসাজি, ভুয়া অর্ডার ও রিভিউ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি ফাইভার অ্যাকাউন্ট স্থগিত এবং আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট তদন্তের আওতায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিটোপিয়ার কর্মীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের নামে ফাইভার অ্যাকাউন্ট খোলা এবং পরে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করা হতো। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভুয়া অর্ডার ও রিভিউ ব্যবহার করে মার্কেটপ্লেসের র্যাংকিং প্রভাবিত এবং প্রতিযোগী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে কয়েকজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারের অভিযোগের পর বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এ সংখ্যাগুলো ফাইভারের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।
এরপর ৪ আগস্ট ফাইভারের বাংলাদেশ কমিউনিটি ফোরামে ‘Ensuring fairness and integrity: an update on coordinated account manipulation’ শিরোনামে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে ফাইভার জানায়, কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্য ব্যক্তিদের হয়ে ফ্রিল্যান্সার অ্যাকাউন্ট তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ভুয়া রিভিউ ও অর্ডারের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেসের সুনাম ও অবস্থান প্রভাবিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও অর্ডার শনাক্ত করার কথাও জানায় প্ল্যাটফর্মটি।
ফাইভার আরও জানায়, নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সেগুলোর মার্কেটপ্লেস অবস্থান কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ কারসাজি শনাক্তে তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার কথাও বলা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য বিটোপিয়ার নাম বা ৩০০টি অ্যাকাউন্টের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের দাবি, পাঁচ হাজারের বেশি কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের নামে ফাইভার অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়েছিল। কর্মীরা নিজেরা এসব অ্যাকাউন্ট পরিচালনা না করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার অধীনেই সেগুলো পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক কয়েকজন কর্মীর দাবি, চাকরি ছাড়ার পরও তাঁদের নামে তৈরি বা ব্যবহৃত ফাইভার প্রোফাইলের নিয়ন্ত্রণ তাঁরা ফিরে পাননি। এতে ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি অনলাইন অ্যাকাউন্টের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের আরও দাবি, বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের কাজ বাতিল করা হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফ্রিল্যান্সার এম এন নাহিদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভুয়া অর্ডার ব্যবহারের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। তাঁর দাবি, বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর ফাইভার গিগে অর্ডার দেওয়া হয় এবং পরে সেটি বাতিল করা হয়।
অভিযোগ প্রকাশের পর বিটোপিয়া বিষয়টি অস্বীকার করে এবং নাহিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করার কথা জানা যায়। পরে বিটোপিয়ার এক সাবেক কর্মীর বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই কর্মী দাবি করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং নিজেদের গিগের র্যাংক বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ভুয়া অর্ডারের কৌশল ব্যবহার করা হতো। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফাইভারের নীতিমালা অনুযায়ী, অন্য ব্যক্তির পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট তৈরি করা এবং একাধিক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেসের কার্যক্রম প্রভাবিত করা নিষিদ্ধ। অন্য ব্যবহারকারীদের তুলনায় অন্যায্য সুবিধা নেওয়া, অর্ডার বা মেসেজিং ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে কর্মীদের পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেগুলো পরিচালনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ফাইভারের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ফাইভারকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি বিটোপিয়া গ্রুপের সাবেক কর্মীদের কেউ কেউ পাসপোর্ট আটকে রাখা, চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে হয়রানির ভয় দেখানো, অনিয়মিত বেতন, অতিরিক্ত কাজ এবং কম পারিশ্রমিকে কাজ করানোর অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছড়িয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
বিটোপিয়ার যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে বিডি কলিং আইটি নামে। পরে প্রতিষ্ঠানটির নাম বিটোপিয়া গ্রুপ হয়। রাজধানীর গুলশান, বনশ্রী ও মহাখালীতে তাদের কার্যালয় রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের হাজারো ফ্রিল্যান্সার ফাইভার, আপওয়ার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে নিজেদের পরিচয়ে বৈধভাবে কাজ করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বাংলাদেশ থেকে সংঘবদ্ধভাবে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বা মার্কেটপ্লেস কারসাজির অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশি অ্যাকাউন্টের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি বাড়তে পারে।
ফলে পরিচয় যাচাই, রিভিউ পরীক্ষা কিংবা অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণের মতো অতিরিক্ত প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত ফ্রিল্যান্সারদের কাজের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম ফ্রিল্যান্সারদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত আরও এগিয়ে যেতে পারে।
এদিকে ১৮ আগস্ট বিটোপিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে জানান, ফাইভারে তাঁর অনেক আইডি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তিনি ফ্রিল্যান্সিং ব্যবসা থেকে বের হয়ে অন্য ব্যবসায় যাওয়ার কথা ভাবছেন।