সার্ভাইক্যাল বা জরায়ুমুখের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে মহিলাদের ক্যান্সারের মধ্যে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে চতুর্থ সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। ২০২২ সালের তথ্য মতে বিশ্বের প্রায় ৬ লক্ষাধিক মহিলা এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ও এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মহিলা মারা যান।
অথচ এটি এমন একটি ক্যান্সার যা সহজে প্রতিরোধ করা যায় এবং প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেকাংশে কম। কিন্তু এই রোগে শতকরা ৯০ ভাগ মৃত্যু হয় বিশ্বের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। এই দেশগুলোতে প্রজননক্ষম নারীদের ক্যান্সারজনিত কারণে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এটি।
বিশ্বব্যাপী জানুয়ারি মাস কে 'জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা' মাস হিসেবে পালন করা হয় এবং বাংলাদেশেও এই ক্যান্সার সচেতনতার জন্য মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয় যাতে করে সবাই সচেতন হতে পারে এবং এই নির্মূলযোগ্যযোগ্য ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারে। বিশ্ব থেকে এই ক্যান্সার নির্মূলের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নির্মূল বলতে বুঝায় প্রতি ১ লাখ নারীতে প্রতিবছর চারজনের নিচে নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ।
কর্মসূচি গুলো :
১) ভ্যাকসিনেশন: ১৫ বছরের মধ্যে ৯০% কিশোরীদের এইচপিভি ভ্যাকসিন প্রদান।
২) স্ক্রীনিং: ৭০% নারীকে জীবনে অন্তত দু'বার (৩৫ ও ৪৫ বছরের মধ্যে) উচ্চমানসম্পন্ন স্ক্রীনিং করানো।
৩) চিকিৎসা: ৯০% ক্যান্সার-পূর্ব অবস্থার চিকিৎসা প্রদান এবং ৯০ শতাংশ নারী যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা।
বিশ্বের সব দেশগুলোতে যদি এই ৯০-৭০-৯০ টার্গেট ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় তাহলে আগামী শতাব্দীর শেষে পৃথিবী থেকে ক্যান্সারটি নির্মূল হবে বলে মনে করা হয়। ভ্যাকসিন এবং ক্যান্সার পূর্ব অবস্থা শনাক্তকরণের জন্য স্ক্রিনিং টেস্ট -এই দুটি প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশের অধিক জরায়ু মুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এই রোগের কারণ কি?
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) নামক একটি গোত্রের ভাইরাস দিয়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সার হয়ে থাকে।
এই ক্যান্সারের রিস্ক ফ্যাক্টর গুলো কি কি:
* বাল্যবিবাহ বা কম বয়সে সহবাস
* অধিক সন্তান ধারণ এবং ঘন ঘন সন্তান প্রসব করা
* বহুগামিতা
* ধূমপান
* দীর্ঘদিন একনাগাড়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন
* মহিলা প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ
* এইচআইভি /এইডস রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি রয়েছে।
লক্ষণ সমূহ:
* প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের কোন লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
* সহবাসের পর রক্তক্ষরণ
* মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার পর পুনরায় রক্তপাত হওয়া
* অনিয়মিত বা অতিরিক্ত রক্তস্রাব
* সাদাস্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত বা চাল ধোয়া পানির মত স্রাব
* তলপেটে ব্যথা
* কোমরে ব্যথা
* হাড়ে ব্যথা
* যোনিপথ দিয়ে প্রস্রাব বা পায়খানা নির্গত হওয়া
* প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া ইত্যাদি।
প্রতিরোধের জন্য যা করণীয়:
ক) ভ্যাকসিন: ৯- ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন দেয়া যাবে। ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি কার্যকরী যদি তা যৌন মিলন শুরুর পূর্বেই দেয়া হয়ে থাকে। এই ভ্যাকসিন এর তিনটি ডোজ রয়েছে। ১৫ বছরের পূর্বে দেয়া গেলে দুটোতেই প্রতিরোধ সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বিনামূল্যে কিশোরীদের মাঝে এই ভ্যাকসিন দেয়া শুরু করেছে।
খ) স্ক্রিনিং টেস্ট: অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে জরায়ুমূখ ক্যান্সারের একটি বড় পার্থক্য হল এটি ক্যান্সার পূর্ব অবস্থায় নির্ণয় করা সম্ভব। ক্যান্সার পূর্ব অবস্থায় চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি ক্যান্সার হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। তাতে করে একজন মেয়ে তার স্বাভাবিক নারীত্ব বজায় রাখতে পারে এবং ব্যয়বহুল ক্যান্সার চিকিৎসা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
গ) এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট
ঘ)প্যাপ স্মিয়ার
ঙ) ভায়া টেস্ট।
এই টেস্টগুলো অত্যন্ত কার্যকরী এবং সহজেই করা যায় । সরকার বিনামূল্যে ৩০-৬৫ বছর বয়সী মহিলাদের গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে ভায়া টেস্ট এর সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।
তাছাড়া জেলা শহরগুলোতে প্যাপ টেস্ট ও এইচপি ভি শনাক্তকরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
ভ্যাকসিন দিলেও স্ক্রিনিং টেস্ট করতে হবে। এই টেস্টগুলো ৩-৫ বছর অন্তর করা হয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহিলারা আসেন জরায়ু-মুখ ক্যানসারের অ্যাডভান্সড স্টেজে যখন কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট অনেকক্ষেত্রেই দেয়া সম্ভব হয় না।
চিকিৎসা:
* সার্জারি
* রেডিওথেরাপি
* কেমোথেরাপি।
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে ধরা পড়েছে তার উপরে । এই চিকিৎসাগুলো ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রণাদায়ক । সবচাইতে ভালো হয় যদি ক্যান্সার পূর্ব অবস্থায় নির্ণয় করা যায় তাহলে সামান্য চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব । এর জন্য প্রয়োজন প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া। হাসপাতালে অন্য চিকিৎসার জন্য আসলেও মহিলাদেরকে জরায়ুমুখের স্ক্রিনিং টেস্টের জন্য উৎসাহিত করা।
ডাঃ মোছাঃ ফারহানা তারান্নুম খান
সিনিয়র কনসালটেন্ট, গাইনী ও গাইনী অনকোলজি
বিআরবি হাসপাতাল, পান্থপথ ,ঢাকা