
ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ঐতিহাসিক আইফেল টাওয়ারে ভয়াবহ আগুন লেগেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। মূলত চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় উদযাপনের সময় উগ্র সমর্থকদের সহিংসতায় প্যারিসের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং নদীর তীরে লাগা আগুনের ধোঁয়া আইফেল টাওয়ারের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। টেসলা সিইও ইলন মাস্কও এক্সে একটি আগুনে পোড়া গাড়ির ভিডিও শেয়ার করে প্যারিসের এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
বিজয় উদযাপন থেকে সহিংসতার সূত্রপাত
মূল ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩০ মে শনিবার ফুটবল ক্লাব আর্সেনালকে পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয় করে। এই ঐতিহাসিক বিজয় উদযাপনের অংশ হিসেবে আইফেল টাওয়ারটিকে পিএসজি ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী লাল, সাদা ও নীল রঙের আলোয় আলোকিত করা হয়। তবে এই আনন্দ উদযাপন একপর্যায়ে উগ্র সমর্থকদের সহিংসতায় রূপ নিলে প্যারিসের রাস্তায় ব্যাপক ভাঙচুর, গাড়ি পোড়ানো, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও আতশবাজি বিস্ফোরণের মাধ্যমে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
ভিডিওর সত্যতা যাচাই ও আসল ঘটনা
সহিংসতার এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জনৈক ব্যবহারকারী একটি ১৮ সেকেন্ডের ভিডিও শেয়ার করে দাবি করেন, ‘প্যারিস জ্বলছে এবং আগুন আইফেল টাওয়ারে পৌঁছে গেছে।’ ভিডিওটিতে দেখা যায়, আইফেল টাওয়ারের একটি অংশ ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
তবে ভিডিওটির মূল উৎস সন্ধান করে জানা গেছে, এটি মূলত লুক অফ্রেট নামের একজন এক্স ব্যবহারকারী প্রথম পোস্ট করেছিলেন। লুক তার পোস্টে স্পষ্ট লিখেছিলেন, ‘সিন নদীর তীরে অগ্নিকাণ্ডের পর আইফেল টাওয়ার ধোঁয়ার মেঘে ঢেকে গেছে এবং এই এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।’ অর্থাৎ আগুন লেগেছিল নদীর তীরে, আইফেল টাওয়ারে নয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই ইলন মাস্ক জ্বলন্ত গাড়ির একটি ভিডিও শেয়ার করে এক্সে লিখেছিলেন, ‘প্যারিসে সমস্যা চলছে।’
প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি
বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ফরাসি প্রশাসন এবার আগে থেকেই বেশ সতর্ক ছিল এবং পুরো ফ্রান্সে ২২ হাজার এবং কেবল প্যারিসেই ৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছিল। বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্যারিসের ট্রাম চলাচল, বেশ কিছু মেট্রো স্টেশন এবং বাস চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তা সত্ত্বেও বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো যায়নি।
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী লরেন্ট নুনিজ ফরাসি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘সহিংসতার জেরে ৮৯০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১৮০ জন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।’
আইফেল টাওয়ারের ঐতিহ্য
ঐতিহাসিক আইফেল টাওয়ারটি মূলত ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তি উদযাপনের লক্ষ্যে ১৮৮৯ সালের বিশ্ব প্রদর্শনীর জন্য গুস্তাভ আইফেল নির্মাণ করেছিলেন। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ‘আয়রন লেডি’ বা লৌহমানবীর পাদদেশে সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা ও ভাঙচুরের দৃশ্য বিশ্বজুড়ে পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র বেদনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি