.jpeg)
পাবনা মানসিক হাসপাতালে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত দুই মানসিক রোগীর মধ্যে ভয়াবহ মারামারিতে ইনজামুল হক (২৬) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় গুরুতর আহত অপর মানসিক রোগী নাজমুল ইসলামকে (২৮) হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। দুজনেই হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রোগী ছিলেন।
গত ৩ জুন ভোররাতের দিকে এই ঘটনা ঘটলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। অবশেষে গত রোববার (৭ জুন ২০২৬) বিকেলে বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বসাধারণের মধ্যে জানাজানি হয়।
ঘটনার বিবরণ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল ইসলাম এবং ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হককে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ভর্তির ওই রাতেই (৩ জুন) আনুমানিক রাত ৩টার দিকে তারা দুজন মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইনজামুল।
এই ঘটনায় নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে অভিযুক্ত করা হয়েছে অপর মানসিক রোগী নাজমুলকে। তবে দুই পরিবারের পক্ষ থেকেই হাসপাতালের চরম গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়েছে:
অভিযুক্ত নাজমুলের স্ত্রীর বক্তব্য: নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "আমার স্বামী দীর্ঘ ৫ বছর ধরে অসুস্থ। সে যে মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে মারধর করে, তা জেনেই সুস্থ করার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। তারা সামলাতে না পারলে আমাদের বলত। কিন্তু এখন সে খুনের আসামি হয়ে গেল।" নাজমুলের বাবার অভিযোগ, তার ছেলেকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে জোরপূর্বক নাজমুলকে আটকে রেখেছে।
নিহতের ভাইয়ের বক্তব্য: মামলার বাদী ইজাজুল হক বলেন, "যে ছেলেটি আমার ভাইয়ের সাথে মারামারি করেছে, সেও তো মানসিক রোগী। এমন দুজনকে কীভাবে একসাথে রাখা হলো? নার্স-সেবাকর্মীরা আমাকে জানিয়েছে, তারা নাকি ভয়ে মারামারি থামাতে যায়নি। এই ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।"
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্ব ও সাফাই
হাসপাতালের সেবাকর্মী ও চিকিৎসকরা নিজেদের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেছেন:
তীব্র জনবল সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব: হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার জানান, পুরুষ সেবাকর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে। মানসিক রোগীদের সামলানোর জন্য কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা নেই। এছাড়া রোগীরা হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠলে ১-২ জন নার্সের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থার অভাব: পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ মৃত্যুর ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, "অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও মারমুখী রোগীদের জন্য হাসপাতালে পৃথক কোনো আইসোলেশন ওয়ার্ড নেই। সীমিত জনবল নিয়ে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।"
যেহেতু মামলার মূল অভিযুক্ত নিজেই একজন গুরুতর মানসিক রোগী, তাই আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এস এম মনিরুজ্জামান জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিক রোগী হওয়ায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ আদালত ও মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে করণীয় জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ পুরো ঘটনার তদন্ত করছে। রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।