
পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মভিসা বাতিল হওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন প্রবাসীরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে অনেকেই বিমানবন্দরে জানতে পারছেন, তাদের ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ।
প্রবাসীদের অভিযোগ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেও অনেকের কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে অবস্থানরত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অনেকেই অনলাইনে ভিসার অবস্থা যাচাই করে ‘ক্যানসেল’ দেখছেন।
এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থলে ফিরতে চাইছেন অনেকে। তবে এ সুযোগে একমুখী বিমান টিকিটের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া টিকিটের দাম এখন ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রবাসীরা।
আবুধাবি প্রবাসী নোয়াখালীর তাহের হোসেন জানান, দুই বছর পর এক মাসের ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে আবুধাবি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখানকার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। ফলে তাকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়।
তাহের হোসেন বলেন, "মনে হলো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।"
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আবুধাবি প্রবাসী শওকত আলী মীরন। আগামী সপ্তাহে ছুটিতে দেশে আসার পরিকল্পনা থাকলেও ভিসা বাতিলের আশঙ্কায় তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, "গত দুই দিন ধরে দূতাবাসে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনো তথ্য বা দিকনির্দেশনা পাচ্ছি না।"
এ বিষয়ে আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা সমাধানে দূতাবাস কাজ করছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনের আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০টি আবেদন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এদিকে রাস আল খাইমাহপ্রবাসী এস এম করিম জানান, গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে দেশে এসেছেন তিনি। কিন্তু ভিসা বাতিলের শঙ্কার কারণে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে চাইলেও উচ্চমূল্যের বিমান টিকিটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, "কয়েক দিন আগেও যে টিকিট ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন একই টিকিটের জন্য ৯৫ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে।"
ভিসা বাতিলের ঘটনায় আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এটি কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা চলছে।
দূতাবাস প্রবাসীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কোনো ব্যক্তি, দালাল বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করতে। ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় সরকারি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; পাকিস্তান, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
তিনি জানান, বিষয়টির কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কূটনৈতিক চ্যানেলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে। তবে আমিরাত সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। ফলে ঠিক কতজনের ভিসা বাতিল হয়েছে বা কেন এমনটি ঘটছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।