
জাতীয় বাজেটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পরিধি প্রতিবছর রেকর্ড গড়ে বিশাল হলেও তা বাস্তবায়নে পদে পদে তোড়জোর হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশ। বড় অংকের বাজেট বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়নের কার্যকারিতায় কেবল ভারত বা ভিয়েতনামের মতো উদীয়মান অর্থনীতিই নয়, ভুটান ও নেপালের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়েও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে ঢাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে এডিপির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায়। একই মেয়াদে মূল জাতীয় বাজেট ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
তবে বাজেট বাড়লেও বাস্তবায়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২১-২২ সালে ৮৬ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৭৮.৭০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে ৭৪.৬৮ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ সালে ৫৫.৪১ শতাংশে এসে ঠেকে। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপির বিপরীতে প্রথম ১১ মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪২.২১ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়ে সর্বনিম্ন রেকর্ড।
উন্নয়ন বাজেটের আকার নির্ধারণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন:
শুরুতে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকার তুলনামূলক ছোট উন্নয়ন বাজেটের চিন্তা ছিল, যাতে বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়। তবে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ও প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখার প্রয়োজন বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বড় এডিপিই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের সক্ষমতার ঘাটতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ভারত ও ভিয়েতনাম: পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের সূচক অনুযায়ী, ভারত নিজেদের উন্নয়ন বরাদ্দের ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ সফলভাবে ব্যয় করে। অন্যদিকে নেসডিসি ইকোনমিক রিপোর্টের তথ্যানুসারে, ভিয়েতনাম ২০২৬ সালে ১.০৮ কোয়াড্রিলিয়ন ডংয়ের সরকারি বিনিয়োগ বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন সম্পন্ন করেছে।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া: ব্যাংকক পোস্ট অনুসারে থাইল্যান্ড প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।
ভুটান ও নেপাল: ছোট অর্থনীতির দেশ হয়েও ভুটান তাদের মোট বাজেটের ৫১ শতাংশ উন্নয়ন খাতে রেখে তার ৮০ শতাংশেরও বেশি ব্যয় করতে সক্ষম হয়। এমনকি দীর্ঘকাল পিছিয়ে থাকা নেপালও গত অর্থবছরে ৪৬.৭৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ১১ মাসের অর্জিত হারের চেয়েও বেশি।
সার্বিক বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন:
নতুন এডিপি বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রকল্প বিশ্লেষকদের মতে, জমি অধিগ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পের নকশায় ঘন ঘন রদবদল, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) অনিয়মিত বদলি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের ধীরগতি এবং অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে তহবিল খালি করার প্রবণতাই মূলত বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ করছে। উপরন্তু, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির দরুন প্রকল্পগুলোতে সময়মতো টাকা ছাড় করতে না পারা বাড়তি সংকট তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, এডিপি বাস্তবায়নে চরম স্থবিরতার ফলে নতুন মহাসড়ক, সেতু, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো জরুরি অবকাঠামো সেবা সময়মতো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের পরামর্শ:
একসঙ্গে অসংখ্য প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প দ্রুত শেষ করলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উন্নয়নের সুফলও দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
একই সুর মিলিয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন:
বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।