
লোহিত সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি—পুরো মধ্যপ্রাচ্য যখন এক চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হলেও তা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মনে করছেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডলইস্ট আই’-এ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে তিনি এই ভূরাজনৈতিক সংকটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।
নেতানিয়াহুর চোখে ইরান ও অক্ষশক্তি
সামি আল-আরিয়ানের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ও নিরাপত্তা কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানকে আঞ্চলিকভাবে একেবারে কোণঠাসা বা নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত তিনি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী সমাধান বা শান্তিকে নিজের বিজয় বলে মানতে রাজি নন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় বিশ্বাস যে, মধ্যপ্রাচ্যের সব সংকটের মূল হোতা ইরান ও তার সমর্থিত শক্তিগুলো। তাই গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা অঞ্চলের অন্যান্য ইরানপন্থী যোদ্ধাদের সম্পূর্ণ দুর্বল না করে যুদ্ধ থামানোকে তিনি পরাজয় হিসেবে দেখেন। নেতানিয়াহু এমন এক মধ্যপ্রাচ্য চান যেখানে একক আধিপত্য থাকবে ইসরাইলের, আর যুক্তরাষ্ট্র থাকবে তাদের প্রধান নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো মূলত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাব বিস্তারের এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। লেখক উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান চালিয়েও ইসরাইল তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি হাসিল করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু একে নিজের ব্যর্থতা না ভেবে, আরও বেশি মাত্রায় কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন অনেকটাই ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে দেশের মানুষ আর ভিনদেশের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে মার্কিন সম্পৃক্ততা দেখতে চাইছে না। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা বা অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে মার্কিন জনসমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় শিবিরের সাধারণ ভোটাররাই এখন দেশের বাইরে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালানোর ঘোর বিরোধী।
বিশ্লেষণে বলা হয়, আমেরিকার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এখন প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলছেন—কেন অন্য দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন নাগরিকদের করের টাকা এবং সামরিক রসদ অপচয় করা হবে? সাধারণ মার্কিনিরাও মনে করেন, এই সব দূরপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণেই মার্কিন বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয় এবং তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
এছাড়া, সামনে থাকা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় সমীকরণ। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে নতুন কোনো বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়বে এবং কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ কঠিন করে তুলবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তা ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই সংকটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট 'হরমুজ প্রণালি'র নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। এই রুটে সামান্য অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
লেখক আরও জানান, ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন-মিসাইল হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন চরম ঝুঁকির মুখে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও এক ধরনের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনকে বুঝতে বাধ্য করছে যে, কেবল গায়ের জোরে বা সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়; দীর্ঘমেয়াদে কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
পর্দার আড়ালে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির খসড়া?
নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই খসড়া প্রস্তাবনার মূল বিষয়গুলো হলো:
কমপক্ষে ৬০ দিনের জন্য সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইরানের ওপর থাকা মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করা।
ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি আপাতত ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য তুলে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইরানের কৌশলগত জয় ও নেতানিয়াহুর অস্বস্তি
সামি আল-আরিয়ানের মূল্যায়ন হলো, এই সমঝোতা সফল হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে বড় স্বস্তি পাবে, অথচ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের (হিজবুল্লাহ, হামাস) প্রভাবও পুরোপুরি শেষ হবে না। আর ঠিক এই কারণেই এই চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হবে।
পরিশেষে লেখক মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। একদিকের পথটি কূটনৈতিক সমাধানের, অন্য পথটি সর্বাত্মক ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের। দীর্ঘমেয়াদে কেবল অস্ত্রের জোরে কোনো রাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারে না। এখন দেখার বিষয়, অঞ্চলটি আলোচনার টেবিলে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে, নাকি নতুন কোনো ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই