
রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রোপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছেন আবাসন ব্যবসায়ী মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে কয়েক বছরের মধ্যে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের বড় একটি অংশ জবরদখলের মাধ্যমে অর্জিত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
৮ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ
নিউগিনি প্রোপার্টিজের পাশেই সাবেক কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার মোট ২৩ কাঠা জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৮ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অতীতে প্রভাব খাটিয়ে ওই ৮ কাঠা জমি দখল করে নিয়েছেন নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিমুদ্দিন, যিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন-সংক্রান্ত একটি মামলায় নাজিমুদ্দিন কারাগারেও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন জানিয়েছেন, সম্প্রতি নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে ৫ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়ে সেখানে স্টুডিও তৈরি করেছিলেন সালমান মুক্তাদির।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের মালিক নাজিমুদ্দিন সম্প্রতি এমনভাবে তিনটি নতুন গেট নির্মাণ করেছেন, যাতে ভেতরে থাকা অন্য জমির মালিকরা আর সেখানে প্রবেশ করতে না পারেন। তাদের অভিযোগ, জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এভাবে গেট দেওয়া হয়েছে।
জমির বিরোধের মধ্যেই স্টুডিওতে হামলা
সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা এতে ক্ষুব্ধ হয়ে লোক ভাড়া করে গেট ভাঙতে যান। কিন্তু নাজিমুদ্দিনের সম্পদ মনে করে তারা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা চালিয়ে সেটি ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যেও জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, সালমানের স্টুডিও ভাঙার উদ্দেশ্যে আলাদা করে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পেছনে জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
নাজিমুদ্দিনকে নিয়ে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই ‘ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী থেকে ভূমিদস্যু নাজিমুদ্দিন’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে তার অতীত, ব্যবসা এবং সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
ধর্মীয় বেশভূষায় পরিচয়, অভিযোগ বহু মামলার
তার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলে অনেকের কাছেই তাকে বড় কোনো আলেম বলে মনে হতে পারে। স্থানীয়দের কাছেও তিনি নিজেকে মাওলানা হিসেবে পরিচয় দেন। সাধারণত ধর্মীয় পোশাকেই তাকে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও করেন।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চিত্র ভিন্ন। কথিত এই মাওলানা দুই ডজন মামলার আসামি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কাউকে পরোয়া করেন না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলাকালে রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দলবল নিয়ে কর্মকর্তাদের মারধর করার অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, থানা পুলিশের কাছেও নাজিমুদ্দিনের প্রভাব ছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং জমি দখলের পরিধি বাড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যের জমি দখল ও ব্যবসার মাধ্যমে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
দখলের অভিযোগে আলোচিত এই ব্যক্তির নাম মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু।
ভাঙাড়ির ব্যবসা থেকে আবাসন ব্যবসায়
নাজিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে। প্রায় ২০১০ সালের দিকে তিনি রাজধানীতে আসেন। রামপুরার একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং সে সময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
পরবর্তী সময়ে ভাসানটেক এলাকায় ভাঙাড়ি ও থাই গ্লাসের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতে ইসলামীর রোকন সদস্য নির্বাচিত হন।
ভাঙাড়ির ব্যবসা করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তিনি আবাসন ব্যবসায় প্রবেশ করেন। গড়ে তোলেন নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান। এরপর দ্রুত তার ব্যবসা ও সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ক্যান্টনমেন্ট থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি আব্বাসের ছত্রছায়ায় তিনি জমি দখলের কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে তিনি বড় আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় স্থানীয়দের কাছে নাজিমুদ্দিন ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগের পরিচয় নিয়েও বিতর্ক
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে নাজিমুদ্দিন নিজেকে গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।
তবে পরে গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা নাজিমুদ্দিনকে চেনেন না এবং তিনি ওই ইউনিটের কমিটিতেও নেই। গত বছরের ১৪ নভেম্বর ইউনিটটির সভাপতি হাজি মো. সাহিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আরিদুল ইসলাম যৌথভাবে স্বাক্ষর করে এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেন।
জোয়ারসাহারায় ১৪ বিঘা জমি দখলের অভিযোগ
জোয়ারসাহারা মৌজায় নাজিমুদ্দিন প্রায় ১৪ বিঘা জমি দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাবের কারণে অসংখ্য মানুষ বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন।
এ ছাড়া কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার জমিও জোর করে দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নিজের জমিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় ওই সাবেক কর্মকর্তা মামলা করেছেন। তবে এখনো তিনি তার জমি ফিরে পাননি।
নাজিমুদ্দিনের দখলে থাকা জমির তালিকায় রয়েছে বোরহান উদ্দিনের নিজ বসতবাড়ির ৩ দশমিক ৩৭ কাঠা জমি, শরফত মোল্লার ৩১ দশমিক ৮২ কাঠা, মইদুর আলীর ওয়ারিশ মোছা. হালিমা খাতুনের ৩ কাঠা, ইকবাল হোসেন গংদের আমমোক্তারনামা মালিক মো. আক্তারুজ্জামানের ১৫ দশমিক ৭৬ কাঠা, শামিমা ইসলাম গংয়ের ১৪ দশমিক ০৬ কাঠা এবং সাজেদুর রহমানের ৩ কাঠা জমি।
এ ছাড়া সাকুরা সাবেরের আমমোক্তারনামা মালিক মো. আক্তারুজ্জামানের ৩ দশমিক ৫০ কাঠা, মো. মোশারফ হোসেন, মো. ফখরুল ইসলাম ও মোসা. শিউলি আক্তারের ৬ কাঠা, সৈয়দ মাহবুবুল গনির আমমোক্তারনামার মালিক মো. মোখলেছুর রহমানের ৭ দশমিক ৮৭ কাঠা এবং মো. হারুন রশীদ গংদের ৯ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও রয়েছে ওই তালিকায়।
এ ছাড়া মোছা মোখলেছুর রহমানের অন্য একটি দাগের ১৩০ দশমিক ৮৫ কাঠা এবং খান মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের ২২ দশমিক ১৮ কাঠা জমি নাজিমুদ্দিন দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ
রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ক্যান্টনমেন্ট থানার জোয়ারসাহারা মৌজার মানিকদী এলাকায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল বলে অভিযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া সেখানে ওই নির্মাণকাজ করছিলেন।
পরে রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নাজিমুদ্দিন ও তার লোকজন রাজউকের কর্মকর্তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় গত ৯ এপ্রিল রাজউকের ইমারত পরিদর্শক শেখ আতিফ হোসেন ইমন রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক শেখ আতিফ হোসেন ইমন বলেন, রাজউকের অনুমোদন না নিয়েই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছিল বলে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। অভিযান চলার সময় বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে নাজিমুদ্দিনের লোকজন তাদের কর্মকর্তাদের মারধর করে বলে তিনি জানান।
পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ
একসময় ভাঙাড়ির ব্যবসা করা নাজিমুদ্দিন মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে দেশজুড়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তার উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রাজধানীর জোয়ারসাহারা মৌজায় সিএস ও এসএ ৬১০, ৬১১, ৬১২, ৬১৩, ৬১৪, ৬১৫, ৬১৬ এবং ২৬৫ নম্বর দাগে প্রায় ১৭ বিঘা জমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭৫ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
বাউনিয়া মৌজায় সিএস ও এসএ-২৫৭ নম্বর দাগে তার ১০ বিঘা জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মিরপুর ডিওএইচএসে ৪ হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। মিরপুর ডিওএইচএস রোডে সিটি কাবাবের ৫ কাঠা জমির মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। লাল মিয়ার টেকের মানিকদীতে ৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বহুতল ভবনের বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বসুন্ধরা এ, বি ও এন ব্লকে তিনটি প্লট এবং একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। তার গ্রামের বাড়িতে প্রায় ৮০ বিঘা জমি রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এর বাইরে দুবাইয়ে নাজিমুদ্দিনের একটি স্বর্ণের দোকান রয়েছে। মালয়েশিয়ায় দুটি দোকান ও একটি তেলের পাম্পে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বলেও জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অস্বীকার নাজিমুদ্দিনের
তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
নাজিমুদ্দিন বলেন, তিনি কারও জমি দখল করেননি এবং জমি দখলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।
রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেটকে মারধরের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজউকের অভিযানের সময় ৪০ থেকে ৫০ জনের বাহিনী নিয়ে তারা অভিযান চালিয়েছিল—এমন পরিস্থিতিতে তারাই তাদের মারধর করেছেন, বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য কি না।
জমিজমা ও নিজের সম্পদ সম্পর্কে নাজিমুদ্দিন বলেন, তার মাত্র ৩ কাঠা জমিতে একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া তার আর কোনো সম্পদ নেই।
নিজের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি যাত্রাবাড়ী ও রামপুরার মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। এরপর হক-হালালিভাবে ব্যবসা করছেন।