
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ফাইভ-জি উপযোগী অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে এক বিশাল দুর্নীতি ও অনিয়মের জাল উন্মোচন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখানো এবং রাষ্ট্রের শত কোটি টাকা অপচয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ মিলেছে এই অনুসন্ধানে।
দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়া এবং দরপত্র মূল্যায়নে সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই ভয়াবহ অনিয়মের নেপথ্যে থাকার অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং বিটিসিএল ও বুয়েটের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের নাম উঠে এসেছে।
ভয়াবহ এই জালিয়াতির ঘটনায় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করেছে দুদক। এর পাশাপাশি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করে তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)-কে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত হচ্ছেন যারা
দুদকের মামলার সুপারিশ তালিকায় স্থান পাওয়া উল্লেখযোগ্য হাইপ্রোফাইল অভিযুক্তরা হলেন:
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী)।
এ এস এম রেজাউল করিম (বিনির্দেশ প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও বিটিসিএল ট্রান্সমিশন পশ্চিমের মুখ্য মহাব্যবস্থাপক)।
মো. শফিকুর রহমান (মহাব্যবস্থাপক-২, ট্রান্সমিশন পূর্ব)।
মো. রফিকুল মতিন (বিটিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক)।
আবু হেনা মোরশেদ জামান (ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব)।
মো. রফিকুল ইসলাম (টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক)।
অধ্যাপক এ সত্য প্রসাদ মজুমদার (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের উপাচার্য)।
ড. মো. ফোরকান উদ্দিন (বুয়েটের অধ্যাপক ও প্রকল্প সদস্য)।
মো. মনজির আহমদ (৫জি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক)।
মো. আজম আলী (সাবমেরিন কেবল কোম্পানির কর্মকর্তা ও কমিটির আহ্বায়ক)।
মো. আমিনুল হক (একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা)।
মো. আনোয়ার হোসেন শিব্দকী (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)।
মো. এনামুল কবীর (সিপিটিইউয়ের রিভিউ প্যানেল সভাপতি)।
এছাড়াও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, অর্থ বিভাগ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং বুয়েটের বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব ও অধ্যাপকসহ এই প্রকল্পে গঠিত ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ ও ‘স্বতন্ত্র কারিগরি কমিটি’র সদস্যদের আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
২৬ টেরাবাইটের চাহিদায় ১২৬ টেরাবাইটের কেনাকাটা!
অনুসন্ধানের নথিমতে, বিটিসিএলের মূল নকশা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যান্ডউইথের সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র ২৬ টেরাবাইট। কিন্তু ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বুয়েটের কারিগরি নির্দেশনা এবং খোদ দুদকের প্রকাশ্য আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে সেই চাহিদাকে এক ধাক্কায় পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার বন্দোবস্ত করে রাষ্ট্রের ৩২৬ কোটি টাকা অপচয়ের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। এই পুরো চক্রের মাস্টারমাইন্ড বা হোতা হিসেবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে চিহ্নিত করেছে দুদক, যাকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে হুয়াওয়ে বাংলাদেশ।
হুয়াওয়ের অনিয়ম ও ব্যাংকের ওপর চাপ
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুয়াওয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্রয় প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করেছে, যা পিপিএ-২০০৬ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়াও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে নথির বাইরে গিয়ে হুয়াওয়েকে অন্যায্য সুবিধা প্রদান করে যোগ্য বিবেচনা করেছে।
সবচেয়ে বড় অনিয়মটি ঘটেছে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে। নিয়ম অনুযায়ী, কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা বা ‘ফ্যাক্টরি প্রোডাকশন অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট’ (এফপিএটি) সম্পন্ন করার আগে কোনো মালামাল জাহাজে তোলার আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের অবৈধ প্রভাবে কোনো প্রকার ফ্যাক্টরি টেস্ট ছাড়াই হুয়াওয়ে তাদের যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। পণ্য বন্দরে আসার পর পরই প্রায় ১০০ কোটি টাকা ছাড় করার জন্য বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ম্যানেজারকে নানামুখী চাপ দিতে শুরু করে হুয়াওয়ে। তবে অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ওই অর্থ ছাড় করেনি।
স্বার্থের সংঘাত ও ফয়েজ তৈয়্যবের ‘চীন সফর’
দুদকের অনুসন্ধান চলাকালীনই ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে বারবার তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা করেন। বাতিল হয়ে যাওয়া সরকারি আদেশ (জিও) পুনরায় সচল করতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে ফাইল পাঠান। এমনকি ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল তিনি দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে এই অনিয়মের মৌখিক অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর ২২ জুন ২০২৫ তারিখে দুদক চেয়ারম্যানকে একটি আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠিয়ে অনুসন্ধান কাজ বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে ফয়েজ তৈয়্যবের একটি চীন সফরের অনুমোদন দেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। সেই সফরের সম্পূর্ণ খরচ বহন করে ‘চায়নিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন মেম্বারস ইন বাংলাদেশ’ (সিইএবি)। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, বিটিসিএলের এই কাজের কার্যাদেশ পাওয়া বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে নিজেই ওই সংগঠনের অর্থায়নকারী ও প্রধান সদস্য। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের খরচে সরকারি কর্মকর্তার এমন বিদেশ সফরকে পিপিআর অনুযায়ী গুরুতর ‘পেশাগত অসদাচরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে দুদক।
হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার বক্তব্য ও বাস্তব চিত্র
এই অনিয়ম নিয়ে হুয়াওয়ে বাংলাদেশের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস (হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়া) অফিসার তানভীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘আপনি দুদকের যে তদন্ত প্রতিবেদনের কথা বলছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত নই। আজ অবধি দুদক থেকে কোনো যোগাযোগও হুয়াওয়ের সঙ্গে করা হয়নি। যে কোনো DNIs (দুর্নীতির) প্রতি হুয়াওয়ে কঠোর শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখে। ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে একটি আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর যাত্রায় অবদান রেখে চলেছি।’
তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তানভীর আহমেদের এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য। দুদক ইতিমধ্যে হুয়াওয়েকে চিঠি দিয়েছিল এবং হুয়াওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের লিখিত জবাবও দাখিল করেছে।
দুদকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়ে বলেন, প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরই দণ্ডবিধির ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। এই দুর্নীতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফাইভ-জি প্রকল্পটি দীর্ঘকাল আটকে থেকে বিটিসিএলের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে হুয়াওয়ের আর কোনো কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।