
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বৈরথ কেবল একটি বাণিজ্যিক লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের এক বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা। ১১টি মানচিত্র এবং তথ্যচিত্রের (চার্ট) মাধ্যমে আল জাজিরা বিশ্লেষণ করেছে কীভাবে এই দুই দেশ সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
১. সামরিক শক্তির বিস্তার ও কৌশলগত অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়েই তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করছে। চার্টগুলোতে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক ব্যয় এখনও বিশ্বে সর্বোচ্চ থাকলেও চীন অতি দ্রুত তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে। কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি এবং সেখানে সামরিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে চীন এই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর অবাধ বিচরণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২. অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই
জিডিপি এবং ক্রয়ক্ষমতার সমতার (PPP) ভিত্তিতে গত কয়েক দশকে চীনের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। মানচিত্রগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সাথে বাণিজ্যিক লেনদেন বেশি করে। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে বিশাল বিনিয়োগ বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবকে আরও সুসংহত করেছে।
৩. প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ
আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপ। চার্টগুলো নির্দেশ করছে যে, চিপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ওপর নির্ভরশীলতা দুই দেশের জন্যই বড় দুশ্চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে চীনের চিপ উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীন নিজস্ব প্রযুক্তির স্বনির্ভরতা অর্জনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে।
৪. জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ
সবুজ শক্তি বা গ্রিন এনার্জির দিকে বিশ্ব ধাবিত হওয়ায় লিথিয়াম এবং কোবাল্টের মতো খনিজ সম্পদের গুরুত্ব বেড়েছে। মানচিত্রগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, এসব খনিজ সম্পদের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বর্তমানে চীনের আধিপত্য অনেক বেশি, যা ইলেকট্রিক গাড়ি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
৫. কূটনৈতিক মিত্র বনাম বৈশ্বিক জোট
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ন্যাটো (NATO) বা কোয়াড (QUAD) এর মতো মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর বিপরীতে চীন ব্রিকস (BRICS) এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (SCO) মতো মঞ্চগুলোকে শক্তিশালী করছে। আল জাজিরার এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে দুই পরাশক্তি এখন মরিয়া।
১১টি ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে করা এই তুলনামূলক বিশ্লেষণটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন একটি ‘বাইপোলার’ বা দ্বিমেরু বিশিষ্ট ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যেখানে একদিকে রয়েছে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সুরক্ষা, আর অন্যদিকে রয়েছে বেইজিংয়ের নতুন বৈশ্বিক শৃঙ্খলা গড়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
সূত্র: আল জাজিরা।