
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, নিট (NEET) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং নীতিগত সংস্কারের দাবিতে দিল্লিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের আঁচ এবার এসে পৌঁছাল পশ্চিমবঙ্গে। দিল্লির আন্দোলনকারীদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতীকী অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেছেন।
সোমবার (২০ জুলাই) সকাল থেকেই প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যলয়ের ঐতিহাসিক পোর্টিকোর নিচে অবস্থান নেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যা পরবর্তীতে প্রতীকী অনশনে রূপ নেয়। একই দিন প্রায় অভিন্ন দাবিতে রাজপথে নামেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ। আন্দোলনরত তরুণদের মূল দাবি—জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি নির্মূল করা এবং প্রশ্নফাঁসের অপসংস্কৃতির চিরতরে পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানান, দিল্লির বিখ্যাত যন্তর মন্তরে চলমান ছাত্রবিক্ষোভ এবং খ্যাতনামা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের প্রতিবাদের সমর্থনে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, মেধার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও একটি বিশ্বাসযোগ্য শিক্ষা কাঠামো তৈরিতে স্বচ্ছ পদক্ষেপ আবশ্যক, অন্যথায় দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
অন্যদিকে, একই দিনে দিল্লির মূল আন্দোলন প্রাঙ্গণে পরিস্থিতির তীব্র অবনতি ঘটে। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে সংসদ ভবন অভিমুখে শুরু হওয়া বিশাল পদযাত্রা আটকানোর চেষ্টা করে দিল্লি পুলিশ। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে চরম ধস্তাধস্তি ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যেখানে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাসের শেল ছুড়ে মারে বলে অভিযোগ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি সামলাতে সেন্ট্রাল দিল্লির বেশ কয়েকটি ব্যস্ততম মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এই সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেই আন্দোলনকারীদের দুজন প্রতিনিধি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডার সাথে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তাদের মূল দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করা হয়। বৈঠকের বিষয়ে জেপি নাড্ডা জানান, আলোচনা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তবে সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিনিধিরা।
এদিকে দীর্ঘ অনশনের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অবশেষে অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তবে ওয়াংচুকের আন্দোলন প্রত্যাহারের পরও জাতীয় স্তরের শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়ছেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
কলকাতার শিক্ষার্থীদের এই সংহতি আন্দোলনকে দিল্লির মূল আন্দোলনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিস্তার হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। দিল্লি ছাড়িয়ে কলকাতা পর্যন্ত ধেয়ে আসা এই উত্তাপ এখন সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিয়ে এক নতুন জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।