
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আইনপ্রণেতাদের ভোটে চুক্তিটি পাস হয়। এর আগে গত আগস্টে মক্কায় সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে তুরস্ক। পরে গত মাসে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়।
চুক্তিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয় বুধবার। সেদিন পার্লামেন্টে এর প্রথম অনুচ্ছেদ পাস হয়। এরপর ডেপুটি স্পিকার জেলাল আদান অধিবেশন মুলতবি করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে অধিবেশন আবার শুরু হলে বাকি অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে আলোচনা করেন আইনপ্রণেতারা।
ভোটাভুটিতে চুক্তির পক্ষে ২৭৯ জন এবং বিপক্ষে ১১৯ জন আইনপ্রণেতা মত দেন। তুরস্কের ৫৯২ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টে এদিন ভোট দিয়েছেন মোট ৩৯৮ জন।
পার্লামেন্টের নথি অনুযায়ী, অনুমোদিত চুক্তিতে রয়েছে মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ। এর প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, সদস্যদেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর কোনো হুমকি দেখা দিলে তা মোকাবিলায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ‘সব প্রয়োজনীয় উপায়’ অবলম্বন করবে। কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে এই বিধান কার্যকর হবে।
চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পারস্পরিক সামরিক সহায়তার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রগুলোর জোটের সশস্ত্র হামলা বা সামরিক আগ্রাসনের মুখে পড়লে বাকি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তার পাশে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার আওতায় থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, চুক্তির এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ন্যাটোর ওই ধারায় বলা হয়েছে, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটো এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়ায় দেশটির সামরিক সম্পদ ও সক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা কিংবা স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন সমালোচকেরা। যদিও তুরস্কের কর্মকর্তারা এ ধরনের আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পারস্পরিক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি চুক্তিতে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সামরিক কার্যক্রমে সমন্বয় এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সদস্যদেশগুলো যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সামরিক রসদ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়াবে।
অনুমোদিত চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ বছর। এই সময় শেষে সদস্যদেশগুলোর চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ছাড়া বর্তমান সদস্যদের সম্মতি পাওয়া সাপেক্ষে নতুন দেশও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবে। ইতোমধ্যে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে সিরিয়া।
তবে তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদিত হওয়াকে সৌদি আরবে দেশটির সেনা মোতায়েনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবে তুর্কি সেনা পাঠানোর আগে আরও কিছু আইনি ও সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
গত অক্টোবরেই তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের জানিয়েছিলেন, পার্লামেন্টে চুক্তি অনুমোদনের পর সৌদি আরবকে কী ধরনের সামরিক বা প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হুথিদের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়ানোর পরিকল্পনা আমাদের একেবারেই নেই।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবকে সহায়তা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হবে দেশটির প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা; কোনো নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নয়।