
গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার পরও যারা নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চায়নি কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর ফিরতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। জনঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আল জামিয়াতুল ইসলাম বাবুনগর মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে দেশের মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো, গণহত্যা ও ব্যাপক সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কোনো বিভেদ থাকতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে আলেম-ওলামাদের রক্ত ঝরিয়েছে যারা, তাদের এ দেশের মানুষ আর রাজনীতিতে দেখতে চায় না। এ বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও আলেম-ওলামাবিরোধী শাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করতে লেগেছে ১৭ বছর। এই দীর্ঘ আন্দোলনে আলেম-ওলামারাও রক্ত দিয়েছেন। শাপলা চত্বরে প্রাণ হারানো অনেকের পরিচয় এবং তাঁদের কবরের অবস্থান এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অসংখ্য মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই শেষ পর্যন্ত ওই সরকারের পতন ঘটেছে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং আগের বছরগুলোতে সংঘটিত গুম, হত্যা ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের ১৬ থেকে ১৭ বছরে প্রায় ৩ হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেও ছিলেন বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'রাব্বুল আলামিন আমার হায়াত রেখেছেন। আপনাদের দোয়া ও আল্লাহর রহমতে আজ বেঁচে আছি।'
এ ছাড়া ওই সময়ে বিভিন্নভাবে প্রায় ৭ হাজার মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা, মামলা ও নানা ধরনের নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূলনীতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি থেকে মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি বাদ দিয়েছিল। সরকার সেই অবস্থানের পরিবর্তন এনে সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি আবারও অন্তর্ভুক্ত করবে। এ সময় উপস্থিত লোকজনের কাছে তিনি জানতে চান, তাঁরা এমন পরিবর্তন চান কি না। জবাবে সমর্থন প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ, সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এই সংযোজন করা হয়েছিল।
ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁরা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁরা কাজ করেছেন। দেশের সব ধর্ম, মত ও জনগোষ্ঠীর মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। জাতির মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজন তাঁরা চান না।
ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারকারীদের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করছেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডে প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা দেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছেন। স্বাধীনতার আগে ও পরেও বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছে। সরকার এই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক আন্দোলন ও সমালোচনার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের সমালোচনা করা যাবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার কর্মসূচি পালন করা হলেও দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেওয়া উচিত নয়। আন্দোলনের নামে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা।