
নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা—বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন প্রথা। ঈদ এলেই শহরের কর্মব্যস্ত মানুষ গ্রামের ধুলোমাটি আর আপনজনদের টানে পথ ধরেন। তবে এবারের ঈদুল আজহার ঈদযাত্রায় ছোট শিশুদের নিয়ে শহর ছাড়ার ক্ষেত্রে অভিভাবক ও মা-বাবাদের চরম সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকেরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান তীব্র গরম এবং দেশজুড়ে ছোঁয়াচে ‘হাম’ রোগের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশুদের সুরক্ষায় এবার গাদাগাদি ভিড় ও জনসমাগম এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। প্রয়োজনে এবারের ঈদে শিশুদের নিয়ে গ্রামে যাওয়া থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গণপরিবহনের গাদাগাদি ভিড়ে বাড়ছে ‘হাম’ এর ঝুঁকি
আমাদের দেশে ঈদযাত্রার সময় বাস, লঞ্চ কিংবা ট্রেন—সব পরিবহনেই থাকে উপচে পড়া ভিড়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরের কথা, ট্রেনের ছাদ কিংবা বাসের হাতল ধরেও মানুষ বাড়ি ফেরে। চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত তীব্র ছোঁয়াচে রোগ, যা মূলত বাতাস, সংস্পর্শ ও শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। এমন জনাকীর্ণ ও বদ্ধ পরিবেশে শিশুদের যাতায়াত করলে তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপক ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে কোনো শিশু হঠাৎ তীব্র অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক ও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে তা শিশুর জীবনশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৫ বছরের কম বয়সীদের ভ্রমণ না করাই উত্তম: ডা. বেনজীর আহমেদ
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, "চরমভাবাপন্ন বৈরী আবহাওয়ায় ছোট বাচ্চাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বড়দের মতো কাজ করে না। ফলে তারা সহজেই সর্দি-কাশিসহ নানান গরমজনিত রোগে অসুস্থ হয়। বর্তমানে এমন আবহাওয়ার ওপর দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। ফলে কোনো এলাকাই এখন বাচ্চাদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই সার্বিক সুরক্ষার স্বার্থে এই ঈদে পাঁচ বছর বা তার কম বয়সী ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণ না করাই উত্তম।"
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, সঠিক সময়ে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হামের নানান জটিলতা থেকে শিশুর জীবনহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। সুতরাং, বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মা-বাবার ঘরে থাকাই নিরাপদ।
বাইরে বের হলেই মাস্ক পরানোর পরামর্শ ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ঈদের ছুটিতে শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে নিয়ে ঘোরাফেরা এবং পার্ক, রেস্তোরাঁ বা জনসমাগমস্থলে না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
"কোনো শিশুর সামান্য জ্বর, সর্দি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসায় ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। শহর কিংবা গ্রাম—সব জায়গায় সবাইকে সমানভাবে সতর্ক থাকতে হবে এবং বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে বের করলে শিশুকে অবশ্যই মাস্ক পরাতে হবে।"
‘টিকা দিলেও শতভাগ নিশ্চয়তা নেই’: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
শুধু বিশেষজ্ঞরাই নন, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঈদ সামনে রেখে গণপরিবহনে বাড়তি ভিড় ও অবাধ যাতায়াতে হামের সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "টিকা দিলেই যে রোগ থেকে সুরক্ষার ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা দেওয়া যায় তা নয়। ভাইরাসের তীব্রতা বেশি হলে দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। তাই এই মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব ও পারস্পরিক সচেতনতাই হলো প্রধান প্রতিরোধ। আক্রান্ত বা সদ্য সুস্থ হওয়া শিশুদের যেন কোনোভাবেই জনাকীর্ণ স্থানে বা আত্মীয়দের বাড়ি নিয়ে যাওয়া না হয়।"
একনজরে দেশের হাম পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ (২৪ মে) তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২৮ জনে। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়া হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহভাজন হামে ৪৪২ জন শিশুর প্রাণ গেছে। গত আড়াই মাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮১৩ জন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে (যথাক্রমে ৫০ ও ১৭৪ জন)।
উৎসবের আনন্দের চেয়ে সন্তানের জীবনের সুরক্ষাই যে কোনো মা-বাবার কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তাই এবারের ঈদে ভ্রমণের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে হলেও শিশুদের নিরাপদ ও সুস্থ রাখাটাই প্রতিটি পরিবারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।