
রাজনীতির অন্দরমহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ডাকসু নেতাদের বৈঠক। ১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাতের পরপরই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, যা দলীয় রাজনীতিতে অস্বস্তি ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ১ জানুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে ডাকসুর আরও কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাসহ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থেকেও এবং গত ১৭ বছর ধরে মামলা, হামলা ও দমন-পীড়নের মুখে থেকেও অনেক ছাত্রদল নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। অথচ অতীতে বিএনপি ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করা ব্যক্তিরা সহজেই সেই সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের মতে, এটি দলীয় রাজনীতিতে বৈষম্যের ইঙ্গিত বহন করে।
একাধিক ছাত্রদল নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “আমরা মামলা, হামলা ও গ্রেফতারের শিকার হয়েছি। সংগঠন ধরে রাখতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়েছি। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, যারা কখনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ছিল না কিংবা বিরোধিতা করেছে, তারাই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ পাচ্ছে। এতে আমাদের কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। এ ধরনের সাক্ষাৎ ছাত্রদলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে। এতে সংগঠনের ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।”
ঢাবি ছাত্রদলের সহ তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আবু জর গিফারী মাহফুজ ফেসবুকে লেখেন, “আমার ছাত্রদলের ত্যাগী ভাইয়েরা জীবন যৌবন, চাকরির বয়স শেষ করে, জীবনের সোনালী সময়গুলো অপচয় করেও তারেক রহমানের দেখা পাবে কি না সন্দেহ আছে! কিন্তু দেখেন সুবিধাবাদী গোষ্ঠীরা ঠিকই পেয়ে গেছে! তোমরাই সফল ভাই।”
সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান বলেন, “আদর্শিক জায়গা থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শিবিরের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। ৫ আগস্টের আগে লীগকে রুষ্টপুষ্ট করার প্রজেক্ট থেকে শুরু করে আগস্ট পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল ও বিএনপিকে নিয়ে যে কুৎসা, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক শত্রুতা শিবির চালিয়েছে, তা ইতিহাসের কালো পাতায় লেখা থাকবে। কোনো সাক্ষাৎ, কোনো ফ্রেম, কোনো কৌশল দিয়ে শিবির যদি এই সত্য ধুয়ে-মুছে ফেলতে চায় সেটি হবে তাদের মুনাফেকি চরিত্রের আরো একটি উদাহরণ।”
এদিকে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “আপনাদের কাছে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে পারাটা একটা অর্জন হতে পারে, আমাদের কাছে না। আমরা ডাকসুর প্রতিনিধি। ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল এরকম মানুষের সঙ্গেই আমাদের নানা সময়ে বসা লাগে। দিজ ইজ ভেরি নরমাল টু আস। হা, উই রেসপেক্ট তারেক রহমান। বাট নট লাইক দ্যাট যে তার সাথে কথা বলা, দেখা করাটা আমাদের জন্য কোনো এচিভমেন্ট। কুল ডাউন অ্যান্ড বি প্রাক্টিক্যাল ডিয়ার বটফোর্স!”
পরবর্তীতে তিনি ওই পোস্টটি মুছে দেন।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দলীয় সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র রাজনীতিতে এই সাম্প্রতিক ঘটনা বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়, আস্থা ও সন্তুষ্টির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হয়, তার ওপরই সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করবে।