
ভাবুন, কয়েক বছর আগে চাকরির আশায় একটি ওয়েবসাইটে নিজের সিভি আপলোড করেছিলেন আপনি। নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, বাসার ঠিকানা, কোথায় পড়েছেন, কোথায় কাজ করেছেন—সবই লিখেছিলেন সেখানে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, কোনো একদিন কোনো নিয়োগকর্তার চোখে পড়বে আপনার জীবনবৃত্তান্ত। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই সিভিই যদি আপনার অজান্তে হাজির হয় এমন এক অনলাইন বাজারে, যেখানে ক্রেতার পরিচয়ও অন্ধকারে, বিক্রেতার পরিচয়ও অজানা?
এমনই এক হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা উদ্বেগ। ‘ম্যাডারক্স’ পরিচয়ধারী একটি হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করেছে, তাদের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সিভি। শুধু দাবি করেই থামেনি তারা। ডার্ক ওয়েবের ‘ডার্ক ফোরামস ডট আরইউ’ নামের একটি ফোরামে এসব তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনও দিয়েছে। তাদের দাবি, তথ্যগুলো এসেছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের ডেটাবেজ থেকে।
কিন্তু গল্পের প্রথম মোড় এখানেই।
বিডিজবস বলছে, তাদের ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ভেঙে এসব তথ্য চুরি হওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।
হ্যাকারদের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ অস্বীকার করছে বিডিজবস, আসল ঘটনা কী?
১৪৮টি সিভি—দাবির পক্ষে প্রথম প্রমাণ
হ্যাকার গোষ্ঠীটি শুধু ‘৬০ লাখ’ সংখ্যাটি ছুড়ে দেয়নি। নিজেদের দাবির সমর্থনে তারা ১৪৮টি সিভির নমুনা প্রকাশ করেছে।
নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সিভিই পুরোনো। বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে সর্বশেষ হালনাগাদ করা সিভির সংখ্যা বেশি। প্রকাশিত সিভিগুলোর মধ্যে দুজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী এবং কয়েক বছর আগে বিডিজবসে নিজেদের সিভি আপলোড করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
এখানেই প্রশ্নটা আরও জটিল হয়।
কারণ পুরোনো সিভি পাওয়া মানেই যে বিডিজবসের সার্ভার হ্যাক হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। তথ্য অন্য কোনো পথেও কারও হাতে যেতে পারে। আবার একই সঙ্গে, বাস্তব ব্যক্তিদের পুরোনো সিভির নমুনা প্রকাশ পাওয়াকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—পুরোনো তথ্য মানেই মূল্যহীন তথ্য নয়।
কেউ হয়তো ২০১৫ সালে যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন, সেটিই এখনো ব্যবহার করছেন। পুরোনো ই-মেইল ঠিকানাও হয়তো সক্রিয়। ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা কর্মজীবনের তথ্যও অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর একই থাকে। ফলে কয়েক বছরের পুরোনো তথ্য দিয়েও একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রতারণা করা সম্ভব।
ডার্ক ওয়েব আসলে কী?
এবার আসা যাক সেই অদৃশ্য জগতের কথায়—যেখানে নাকি বাংলাদেশের ৬০ লাখ সিভির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
‘ডার্ক ওয়েব’কে অনেক সময় ইন্টারনেটের কোনো রহস্যময়, আলাদা গ্রহ হিসেবে কল্পনা করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি একটু ভিন্ন। আমরা প্রতিদিন যে ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করি—গুগল, ফেসবুক, সংবাদমাধ্যম কিংবা সাধারণ অনলাইন শপ—সেগুলো মূলত সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া যায় এমন ওয়েবের অংশ। এর বাইরে রয়েছে ডিপ ওয়েব—যে ওয়েব কনটেন্ট সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে দেখা যায় না। আপনার জিমেইলের ইনবক্স, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তিগত পৃষ্ঠা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেসও ডিপ ওয়েবের উদাহরণ হতে পারে।
ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবের এমন একটি অংশ, যেটিতে প্রবেশের জন্য বিশেষ নেটওয়ার্ক বা সফটওয়্যার প্রয়োজন হয়। এর সবচেয়ে পরিচিত অবকাঠামো হলো টর নেটওয়ার্ক। টরের ‘অনিয়ন সার্ভিস’ সাধারণ ওয়েবসাইটের মতো সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে সার্ভারের অবস্থান প্রকাশ করে না। টর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যবহারকারী ও সেবার মধ্যে যোগাযোগ এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে উভয় পক্ষের অবস্থান গোপন রাখা যায়। টর প্রকল্পের ভাষায়, অনিয়ন সার্ভিসের অবস্থান ও আইপি ঠিকানা গোপন থাকে এবং যোগাযোগ টর নেটওয়ার্কের ভেতরেই এনক্রিপ্টেড অবস্থায় চলতে পারে।
টুইস্টটা হলো—ডার্ক ওয়েব মানেই অপরাধ নয়, ডার্ক ওয়েবের প্রযুক্তি নিজে অবৈধ নয়। সাংবাদিক ও তথ্যদাতাদের নিরাপদ যোগাযোগ, সেন্সরশিপ এড়িয়ে তথ্য প্রকাশ, গোপনীয় ফাইল আদান-প্রদান—এসব বৈধ কাজেও অনিয়ন সার্ভিস ব্যবহার করা হয়। টর প্রকল্প নিজেই সাংবাদিকদের তথ্যদাতা ব্যবস্থার মতো বৈধ ব্যবহারের উদাহরণ দিয়েছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন একই গোপনীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে চুরি করা তথ্য, ম্যালওয়্যার, প্রতারণার সেবা কিংবা অবৈধ পণ্য কেনাবেচা শুরু হয়। অর্থাৎ ডার্ক ওয়েব কোনো একটি অপরাধী সংগঠনের নিয়ন্ত্রিত জায়গা নয়।
এখানে কোনো একক ‘পরিচালক’ নেই। টর একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক; বিভিন্ন রিলে ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর মাধ্যমে যোগাযোগ পরিচালিত হয়। আর ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন ফোরাম, মার্কেটপ্লেস বা সেবা আলাদা আলাদা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিচালনা করতে পারে। তাই ‘ডার্ক ওয়েবের পরিচালক কে?’—এর একক উত্তর নেই।
কারা ব্যবহার করে এই জগত?
একই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী একেবারেই ভিন্ন ধরনের হতে পারেন। সাংবাদিক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা গোপনীয়তা রক্ষায় আগ্রহী সাধারণ ব্যবহারকারী যেমন থাকতে পারেন, তেমনি থাকতে পারে সাইবার অপরাধী, তথ্য চোর, প্রতারক, ম্যালওয়্যার বিক্রেতা এবং চুরি করা তথ্যের ক্রেতারা। এ কারণেই ডার্ক ওয়েবকে শুধু ‘অপরাধীদের ইন্টারনেট’ বলা যেমন পুরোপুরি সঠিক নয়, তেমনি এর অপরাধমূলক বাজারগুলোকে হালকাভাবে দেখাও বিপজ্জনক।
কী ছিল সেই বিজ্ঞাপনে?
বাংলাদেশি সিভি নিয়ে যে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে হ্যাকার গোষ্ঠীটি দাবি করেছে—তাদের কাছে বিডিজবসের ৬০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সিভি রয়েছে। তাদের কথিত ডেটাবেসে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণের তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।
মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার মার্কিন ডলার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—তারা জানিয়েছে, সর্বোচ্চ পাঁচজন ক্রেতার কাছে এই তথ্য বিক্রি করা হবে। অর্থ পরিশোধের জন্য পেটিএম, ওয়াইজ, পেইইউ এবং বাইন্যান্সের মতো মাধ্যমের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
একজন বিক্রেতা যদি একই ডেটাবেস হাজার মানুষের কাছে দিয়ে দেন, তাহলে সেটির একচেটিয়া বাজারমূল্য কমে যেতে পারে। কিন্তু সীমিত সংখ্যক ক্রেতার কাছে বিক্রির দাবি করলে ডেটাটিকে ‘এক্সক্লুসিভ’ হিসেবে দেখানো যায়।
সত্যি কি ৬০ লাখ মানুষের তথ্য হ্যাক হয়ে গেছে?
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে এমন কথা বলা যায় না। কারণ, হ্যাকার গোষ্ঠীর দাবি আছে, ১৪৮টি নমুনা আছে, কিছু নমুনার সঙ্গে বাস্তব ব্যক্তির মিলও পাওয়া গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিডিজবস বলছে, তাদের সিস্টেম থেকে তথ্য চুরি হয়নি।বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুর জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষাকে প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং ব্যবহারকারীর প্রোফাইল কে দেখতে পারবেন, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণও রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বিডিজবসে নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক নিয়োগকর্তা চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য দেখতে পারেন। তবে বিডিজবসের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই তথ্য তাদের নিজস্ব নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাজে ব্যবহারের জন্যই দেওয়া হয়। কোনো নিয়োগকর্তা তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করলে এবং বিষয়টি বিডিজবসের নজরে এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হ্যাকারদের হাতে সত্যিই ওই ১৪৮টি সিভি আছে।
তারা এগুলো পেল কোথা থেকে, বিডিজবসের সার্ভার ভেঙে, কোনো পুরোনো ব্যাকআপ থেকে, কোনো নিয়োগকর্তার অ্যাকাউন্ট থেকে, কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে? নাকি বহু জায়গা থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো তথ্য একত্র করে সেটিকে ‘বিডিজবসের ৬০ লাখ সিভি’ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে? প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখনো এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নেই।
তাই ‘৬০ লাখ সিভি হ্যাক’—এর বদলে এই মুহূর্তে বেশি নির্ভুল ভাষা হলো ‘৬০ লাখ সিভি থাকার দাবি করে ডার্ক ওয়েবে বিক্রির বিজ্ঞাপন’।
ঘটনাটি প্রকাশ পেল কীভাবে?
প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি সামনে আসে ডার্ক ওয়েব ফোরামে ওই বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর। এরপর সংবাদমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপন, প্রকাশিত ১৪৮টি নমুনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রথম আলো প্রকাশিত নমুনাগুলোর মধ্যে দুজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে সিভির তথ্যের সঙ্গে তাদের পূর্বে বিডিজবসে সিভি আপলোড করার বিষয়টির মিল পেয়েছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নামকে ‘এই ৬০ লাখ সিভির হ্যাক উদঘাটনকারী’ হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট গবেষককে কৃতিত্ব দেওয়া বা কোনো সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নাম বসিয়ে দেওয়া এই মুহূর্তে তথ্যগতভাবে নিরাপদ হবে না।
কিন্তু সিভি চুরি হলে এত ভয় কেন?
কারণ একটি সিভি দেখতে যতটা সাধারণ, কয়েকটি সিভি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে তার মূল্য ততটাই বাড়ে।
একটি সিভিতে নাম আছে।
আরেকটিতে ফোন নম্বর।
সঙ্গে ই-মেইল।
তার সঙ্গে বাসার ঠিকানা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা।
কর্মজীবনের ইতিহাস।
প্রশিক্ষণ।
কখনো ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় বা অন্যান্য যোগাযোগের তথ্যও থাকতে পারে।
এই তথ্যগুলো এক জায়গায় এনে একজন মানুষের একটি বিস্তারিত ‘ডিজিটাল প্রোফাইল’ তৈরি করা সম্ভব।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেছেন, এ ধরনের তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে সাইবার অপরাধীরা একজন ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পরিচয় জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রতারণা করা সম্ভব। আরেকটি বিপজ্জনক জায়গা—ভুয়া নিয়োগ
ধরুন, আপনার সিভি থেকে কেউ জানল আপনি হিসাবরক্ষণে কাজ করেন এবং কয়েক বছর আগে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ছিলেন। এরপর আপনার কাছে ফোন এলো—
‘আপনার প্রোফাইল আমরা দেখেছি। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে আপনার জন্য চাকরি আছে।’ আপনি অবাক হলেন না। কারণ কথাগুলো আপনার সিভির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তারপর পাঠানো হলো একটি নিয়োগপত্র।
এরপর বলা হলো—
‘ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিন।’
অথবা—
‘ভেরিফিকেশনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি পাঠান।’
অথবা—
‘প্রশিক্ষণ ফি দিতে হবে।’
এখানেই সিভির তথ্য অপরাধীর হাতে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনও সতর্ক করেছে, ভুয়া নিয়োগদাতারা চাকরিপ্রার্থীর ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য নেওয়ার জন্য আসল প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচয় ব্যবহার করতে পারে। এমনকি চাকরির ওয়েবসাইটে সিভি আপলোড করা ব্যক্তিকেও লক্ষ্য করা হতে পারে। আর সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এটিই সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা—অপরাধী প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের বিশ্বাসকে বেশি কাজে লাগায়।
কারা এসব সিভি কিনতে পারে?
এখানে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাবা যায়। প্রথমত, সাইবার অপরাধী—যারা পরবর্তী প্রতারণার জন্য তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ফিশিং বা সামাজিক প্রকৌশল পরিচালনাকারী চক্র—যারা আগে থেকেই ব্যক্তির নাম, চাকরি ও যোগাযোগের তথ্য জানলে আরও বিশ্বাসযোগ্য বার্তা তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিচয় জালিয়াতি চক্র—যারা অন্য উৎসের তথ্যের সঙ্গে সিভির তথ্য মিলিয়ে একজন ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, ডেটা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অপরাধী গোষ্ঠী—যারা একটি ডেটাবেস কিনে আবার অন্য জায়গায় বিক্রি করতে পারে।
তবে এখানে সতর্কতা জরুরি—এই নির্দিষ্ট ৬০ লাখ সিভি কে কিনেছে বা আদৌ কেউ কিনেছে কি না, সে তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়।
কেন কিনবে?
কারণ তথ্যের মূল্য শুধু তথ্যের মধ্যে নয়—তথ্যগুলো একসঙ্গে থাকার মধ্যে।
একজনের নাম হয়তো ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়। একজনের ফোন নম্বরও হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু একই সঙ্গে তার নাম, ফোন, ই-মেইল, ঠিকানা, পড়াশোনা এবং চাকরির ইতিহাস পাওয়া গেলে অপরাধীর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ অনেক সহজ হয়।
এ ধরনের তথ্য দিয়ে ব্যক্তিভেদে আলাদা আলাদা প্রতারণার গল্প তৈরি করা সম্ভব।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত তথ্যের এমন সমন্বিত প্রোফাইল লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং ও প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
তাহলে কি আমাদের সব তথ্য হাতছাড়া?
না। অন্তত এই ঘটনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।
প্রথমত, আলোচিত ডেটাবেসে কী পরিমাণ তথ্য সত্যিই আছে, তা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, প্রকাশিত নমুনার বড় অংশ পুরোনো।
তৃতীয়ত, বিডিজবস দাবি করেছে তাদের সিস্টেম থেকে তথ্য ফাঁস হয়নি।
চতুর্থত, একটি সিভিতে থাকা তথ্যের অর্থ এই নয় যে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পাসওয়ার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্রের পূর্ণ তথ্যও একই সঙ্গে হ্যাকারদের হাতে চলে গেছে।
অর্থাৎ একটি সিভি ফাঁস হওয়া আর একজনের সব ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। তবে ঝুঁকিটাও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ ফাঁস হওয়া তথ্য অন্য কোনো উৎসের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হলে অপরাধীর হাতে একজন ব্যক্তির সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য চলে আসতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো আজ নয়, আগামীকাল
ধরুন, আপনার সিভির তথ্য ২০১৪ সালের।
আপনি ভাবলেন—‘এত পুরোনো তথ্য দিয়ে কী হবে?’ কিন্তু সেই একই ফোন নম্বর আপনার কাছে আছে। একই ই-মেইল ব্যবহার করছেন। আপনার কর্মক্ষেত্রও হয়তো একই খাতে। তাহলে ২০১৪ সালের তথ্যও ২০২৬ সালে আপনাকে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
তারপর আপনার কাছে এল একটি বার্তা—
‘আপনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেখানে নতুন একটি পদে নিয়োগ চলছে।’
আপনার নাম, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা—সবই ঠিক। আপনি বিশ্বাস করলেন।
আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে আসল প্রতারণা।
চাকরিপ্রার্থীদের কী করা উচিত?
প্রথম কাজ—আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়া।
অপরিচিত কোনো নিয়োগদাতা হঠাৎ যোগাযোগ করলে শুধু আপনার সিভির তথ্য জানে বলেই তাকে বিশ্বাস করা যাবে না।
চাকরি দেওয়ার আগে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র, পাসওয়ার্ড বা অন্য সংবেদনশীল তথ্য চাইলে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে।
অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা বা সন্দেহজনক ফাইল ডাউনলোড করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
কোনো চাকরির প্রস্তাব এলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা যাচাই করা যোগাযোগমাধ্যম দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা উচিত।
আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নির্দেশনাতেও ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার আগে নিয়োগদাতা যাচাই এবং সন্দেহজনক চাকরির প্রস্তাবে অর্থ না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই গল্পের আসল হ্যাকার কে?
এই মুহূর্তে তার উত্তরও অন্ধকারে।
‘ম্যাডারক্স’ নামে পরিচয় দেওয়া গোষ্ঠীটি নিজেদের হাতে ৬০ লাখ সিভি থাকার দাবি করেছে। তারা ১৪৮টি নমুনা দেখিয়েছে।
তারা বিডিজবসকে উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বিডিজবস সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো তিনটি—
এই তথ্যগুলো সত্যিই কার কাছ থেকে এসেছে?
৬০ লাখের দাবিটি সত্য, নাকি অতিরঞ্জিত?
আর যদি তথ্য সত্যিই চুরি হয়ে থাকে, তাহলে চুরির পথটি কোথায়?
এই তিন প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি হ্যাক হয়েছে’—এটিকে চূড়ান্ত সত্য বলা যাবে না। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই পরিষ্কার।
আমরা যে তথ্যকে সাধারণ মনে করি—নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, পড়াশোনা, চাকরির ইতিহাস—অপরাধীর হাতে সেগুলো আলাদা আলাদা তথ্য থাকে না। সেগুলো একত্র হলে একজন মানুষ সম্পর্কে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিচয়।
আর সেই পরিচয় যদি এমন একটি বাজারে পৌঁছে যায়, যার ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় দুটোই অন্ধকারে, তখন বিপদটা শুধু ‘ডেটা ফাঁস’ থাকে না। তা হয়ে ওঠে বিশ্বাস ফাঁস হওয়ার গল্প। কারণ আগামীকাল আপনার ফোনে যে মানুষটি বলবে—‘স্যার, আপনার সিভি দেখে আপনাকে চাকরির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে’—সে সত্যিই কোনো নিয়োগকর্তা, নাকি আপনার চুরি হয়ে যাওয়া তথ্য দিয়ে তৈরি করা একজন প্রতারক—সেটিই তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।