
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে কোনো এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (গুম), বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি।
শনিবার সন্ধ্যায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল ডিসকাশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান), সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী ও বলপূর্বক অন্তর্ধান সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী শহীদুল আলম, নেত্র নিউজের এক্সিকিউটিভ এডিটর নাজমুল আহসান প্রমুখ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘ফ্র্যাজাইল’ (ভঙ্গুর) অবস্থায় পেয়েছিল। গত ছয় মাসে বাহিনীগুলোর নৈতিকতা, মনোবল ও মোটিভেশন বাড়ানোর কাজ করা হয়েছে।
নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি নিজেও এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার হয়েছি। ফলে দেশে একটি শক্তিশালী গুম প্রতিরোধ আইন প্রতিষ্ঠা করা আমাদেরও প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, “আমি হোম মিনিস্টার, আমি এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার, আমি কি চাইব না বাংলাদেশে একটা শক্তিশালী গুম প্রতিরোধ আইন হোক?”
মন্ত্রী আরও বলেন, “এখানে কি আমাদের কারও কোনো অন্যরকম স্বার্থ থাকতে পারে? না। আমরা আজ সরকারে আছি, আগামীতে তো নাও থাকতে পারি। কিন্তু এই আইনটা থাকবে। এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার যেই হোক, সে বিচার পাবে।”
র্যাবের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করার জন্য আইন আনা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে এটি আসবে। তবে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সময়ে সাইবার ক্রাইম মোকাবিলায় ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট, সাইবার ইন্টেলিজেন্স ও অ্যানালাইসিস সক্ষমতা প্রয়োজন।
মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়েও সরকার আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আইন প্রণয়নের চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, আইনজীবী ও কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের এই আইনটা করতে হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হওয়ায় তিনি দেশে ফিরতে পেরেছেন। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিরা যাতে দ্রুত ও যথাযথ বিচার পেতে পারেন, এমন আইন করার প্রত্যাশার কথাও জানান।
তিনি আরও বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে পুলিশকে স্বাভাবিক গতিতে আনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে।
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের ‘কথিত অন্তর্ধান’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’-এর ফলে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সেজন্য তারা ক্ষুব্ধ হয়ে কোস্টগার্ডের অফিসে হামলা চালানোর ঘটনায় একটি কোস্টগার্ড কেন্দ্রিক মামলা হয়।
তিনি বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তেও কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তথাপি, ঘটনাটি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে নিজের গুম হওয়ার ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ৫ বাই ১০ ফুটের একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন ছাড়াই তাকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়। সেখানে তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর আশঙ্কায় কাটাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। পরে চোখ বেঁধে তাকে ভারতের শিলংয়ে পাচার করে দেওয়া হয়। সেখানে কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যান। পরে ভারতীয় আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ নতুনভাবে স্বাধীন হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বীর ছাত্রদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফ্যাসিবাদী আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারবর্গ নিজেদের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এর আগে মন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। উদ্বোধনের পর তিনি প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন।