
নেপাল ও চীনের তিব্বতে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নেপালে ৭৩৪ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৪৪ জন। নিখোঁজদের মধ্যে নেপালে ২ হাজার ৪৯৮ জন এবং তিব্বতে ৫৪৬ জন রয়েছেন।
নেপালের ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৪৯৮ জন। সর্বশেষ সরকারি হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনের তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত কয়েকটি জেলা থেকে মানবদেহ ও দেহাবশেষসহ মোট ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে। সেখানে ২৫৯টি মরদেহ পাওয়া গেছে। এরপর নাওয়ালপরাসি ইস্টে ১৮৪টি এবং নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ৮২টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া গোরখায় ৫৮টি, নুয়াকোটে ৫২টি, ধাদিংয়ে ৫০টি, তানাহুনে ৩৬টি এবং রাসুয়ায় ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষ ও বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে বহুদূর ভাটির দিকে চলে যাওয়ায় অনেক মরদেহ কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রাসুয়া জেলায়। জেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ৫৬২ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নুয়াকোটে নিখোঁজ রয়েছেন ১১৫ জন এবং মাকওয়ানপুরে ৬৫ জন।
নিখোঁজদের তালিকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৩৩ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং তাঁদের সঙ্গে ভ্রমণরত ১২৭ জন নেপালিও নিখোঁজ রয়েছেন। একই তালিকায় ৮৫ জন নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫ জন, নেপাল পুলিশের ২৭ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ জন সদস্য রয়েছেন।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় আহত হয়েছেন ২৪২ জন। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির পাশাপাশি চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো চলছে। এসব কার্যক্রমে মোট ১৯ হাজার ৮৯৫ জন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৮ হাজার ৩৯৯ জন, পুলিশের ৭ হাজার ২১৩ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৪ হাজার ২০৩ জন সদস্য রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ৮ হাজার ১৮৬ জনকে উদ্ধার করেছেন। উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত দুই দিনে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আটকে থাকা ২৭৯ জনকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ২২৭ জন বিদেশি নাগরিককে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যেসব মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো সংরক্ষণ এবং পরিচয় শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন জেলার ২১টি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণের অর্থ ও সামগ্রী বিতরণ শুরু করেছে। রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা প্রত্যেকে ১০ কোটি নেপালি রুপি করে নগদ সহায়তা পেয়েছে। ধাদিং জেলাকে দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি রুপি। এ ছাড়া ১৫টি স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে আরও ৬৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি বিতরণ করা হয়েছে।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সরকার ৩৭টি ট্রাক পাঠিয়েছে। ত্রাণ সরবরাহের জন্য সাতটি হেলিকপ্টার ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার উত্তরগয়া ও ধুনচেতে আকাশপথে দুই টন খাদ্য পাঠানো হয়েছে।
উদ্ধারকাজ এবং ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সহায়তার জন্য নৌয়াকোটে জ্বালানির মজুতও রাখা হয়েছে। সেখানে ৩৬ হাজার লিটার ডিজেল ও ২৪ হাজার লিটার পেট্রোল সংরক্ষণ করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার লিটার এভিয়েশন ফুয়েল বা বিমান জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে। মজুত রয়েছে আরও ১৪ হাজার লিটার।
এদিকে আজ রোববার চীন জানিয়েছে, নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী একটি স্থলবন্দর এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের পর তিব্বতের অংশে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১৬ জনে পৌঁছেছে। চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কর্মকর্তারা এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেপালের নাগরিক—১০৪ জন। এ ছাড়া ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ার, ১৮ জন মার্কিন এবং ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
চীনা কর্মকর্তারা আরও জানান, বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে অবহিত করেছে।