
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ‘নো কিংস’ শিরোনামে এই প্রতিবাদী আন্দোলন এবার তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আগের বার কয়েক মিলিয়ন মানুষ অংশ নিয়েছিল।
বিক্ষোভের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তারা ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ, কেন্দ্রীয় অভিবাসন নীতিমালা এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। আয়োজকদের বক্তব্য, ‘ট্রাম্প আমাদের ওপর একজন স্বৈরশাসকের মতো শাসন করতে চান। কিন্তু এটি আমেরিকা, আর ক্ষমতার মালিক জনগণ—কোনো উচ্চাভিলাষী রাজা বা তার কোটিপতি বন্ধুদের হাতে ক্ষমতা নয়।’
হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র এই বিক্ষোভকে সমালোচনা করে বলেছিলেন, এটি ‘ট্রাম্প ডের্যাঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন’ এবং কেবলমাত্র সেই সংবাদমাধ্যমের জন্য খবরের যোগ্য, যারা কভারেজের বিনিময়ে অর্থ পান।
গত শনিবার ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে লোকজন অবস্থান নেয় এবং ন্যাশনাল মল এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের কুশপুতুল প্রদর্শন করে তাদের অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
মিনেসোটা বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। গত জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে রেনি নিকোল গুড ও অ্যালেক্স প্রেত্তি নামে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেন্ট পলের স্টেট ক্যাপিটল ভবনের সামনে সমাবেশে ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন তার অভিবাসন-বিরোধী আইন নিয়ে লেখা গান ‘স্ট্রিটস অফ মিনিয়াপলিস’ পরিবেশন করেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির টাইমস স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। জনসমাগম এত বড় ছিল যে পুলিশকে ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তাগুলো বন্ধ করতে হয়। গত অক্টোবর মাসে শহরটির পাঁচটি বরো মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ চলাকালীন সহিংসতা ঘটে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারী রয়্যাল ফেডারেল বিল্ডিং ঘেরাও করে কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সিমেন্টের ব্লক ছুঁড়ে মারে। এতে দুই কর্মকর্তা আহত হন এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের কাছে ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ অমান্য করার কারণে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং জনতাকে সরাতে ‘নন-লেথাল’ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডালাসেও পাল্টা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে কিছু মানুষকে আটক করা হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প একাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অংশ পুনর্বিন্যাস এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের আপত্তি সত্ত্বেও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা রয়েছে। এছাড়া তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প নিজেকে রাজা বা স্বৈরশাসক হিসেবে মানতে নারাজ। ফক্স নিউজকে তিনি বলেছেন, ‘তারা আমাকে রাজা বলছে, কিন্তু আমি রাজা নই।’ তার দাবি, তিনি একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই উদ্যোগগুলো অসাংবিধানিক এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলো ছাড়াও শেলবিভিল ও হাউলের মতো ছোট শহরগুলোতেও মানুষ যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। দেশজুড়ে নয়, প্যারিস, লন্ডন ও লিসবনেও প্রবাসী মার্কিনিরা জড়ো হয়ে ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তার অভিশংসন দাবি করেছেন।
গত অক্টোবরের ‘নো কিংস’ র্যালিতে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এবার শিকাগো, বোস্টন, ন্যাশভিল ও হিউস্টনের মতো শহরগুলোতেও প্রতিবাদ দেখা গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকটি রাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।