
নতুন স্পিকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পর্দা উঠল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম অধিবেশনের। তবে সূচনালগ্ন থেকেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের তীব্র রাজনৈতিক তরজা, পাল্টাপাল্টি স্লোগান এবং ওয়াকআউটের জেরে রণক্ষেত্রের রূপ নেয় বিধানসভা কক্ষ।
শুক্রবার (১৫ মে) অধিবেশনের প্রথম দিনেই তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের সাময়িক কক্ষত্যাগ সংসদীয় উত্তাপকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
নবনির্বাচিত স্পিকার রথীন্দ্রনাথ দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়ে প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানান। নিজের বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গঠনমূলক বিরোধিতা চাই। বিধানসভা মারামারির জায়গা নয়। সংবিধানের পরিভাষায় House belongs to the Opposition।’
তিনি সদনে আশ্বাস দিয়ে আরও বলেন যে, বিধানসভায় সরকার ও বিরোধী পক্ষ সমানভাবে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবে।
ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে শাসক-বিরোধী সংঘাত
মুখ্যমন্ত্রীর পর নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন বিরোধীদলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তবে তাঁর বক্তব্যে মূল ফোকাস ছিল ভোট-পরবর্তী সহিংসতা। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ভয় চলে যাবে, ভরসা আসবে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ মানুষের মধ্যে ভরসা নেই, বরং ভয় আরও বেড়েছে। বহু মানুষ ঘরছাড়া।’
আক্রান্ত ও ঘরছাড়া মানুষদের দ্রুত ও নিরাপদে নিজ নিজ আবাসে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
বিরোধী দলনেতার এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পালটা যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘কেউ ঘরছাড়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তারা ঘরছাড়া হয়ে থাকলে পুলিশ তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেবে। তবে ২০১১ সালের ভোট-পরবর্তী সহিংসতার সঙ্গে যাদের যোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কড়া প্রতিক্রিয়া অন্য বিধায়কদের
এরপর অধিবেশনে একে একে বক্তব্য রাখেন বিজেপি বিধায়ক তথা প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। সহিংসতার কথা স্মরণ করে নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, ‘২০২১ সালে জয়ের পর মনে হয়েছিল, (যদি) ইস্তফা দিলে কর্মীদের বাঁচানো যায়, তবে সেটাই করব।’
অন্যদিকে তৃণমূলকে নিশানা করে তাপস রায় বলেন, ‘অতীতে বিজেপি প্রার্থীদের হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আজ তারাই আবার পোস্ট-পোল ভায়োলেন্সের কথা বলছেন।’
তিনি আরও দাবি করেন, তৃণমূল যদি পুনরায় ক্ষমতায় আসত, তবে বহু বিজেপি কর্মীকে প্রাণ হারাতে হতো।
স্লোগান-পাল্টা স্লোগান ও তৃণমূলের ওয়াকআউট
প্রকৃতপক্ষে, অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল বিধানসভার অন্দরমহল। শাসকদল বিজেপির বিধায়কেরা উচ্চস্বরে ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে শুরু করলে বিরোধী আসনে থাকা তৃণমূল বিধায়কেরা পাল্টা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে গর্জে ওঠেন। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন বিজেপির আইনপ্রণেতারা ‘চোর চোর’ এবং ‘ফাইল চোর মমতা’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। জবাবে তৃণমূলের প্রতিনিধিরাও ভোট লুটের অভিযোগ এনে চিৎকার করতে থাকেন।
এই হট্টগোল ও চরম উত্তেজনার মাঝেই স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। এর পরেই এক অভিনব অভিযোগ তোলে তৃণমূল। জাতীয় সঙ্গীত সঠিকভাবে গাওয়া হয়নি—এই দাবি তুলে তারা একযোগে বিধানসভা কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। এর ফলে কিছুক্ষণের জন্য বিরোধী আসন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ে, যদিও মিনিট কয়েকের ব্যবধানে তৃণমূল বিধায়কেরা আবার নিজ আসনে ফিরে আসেন। সব মিলিয়ে, প্রথম কার্যদিবসেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা দেখল নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক সংঘাতের চিত্র।