
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ঘিরে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আব্দুল মতিন অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, নিজের উপার্জনের অর্থে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ২০০৪ সালে মমতাজ বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এছাড়া তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। চলতি বছরের ২৯ মে আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকেই পারিবারিক বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
পরিবারের অভিযোগ, শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের দেওয়া অনুদান থেকে ৭ লাখ টাকা কাবিন এবং প্রায় সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুল মতিন। দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানার পর গত ২ জুন প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন।
মমতাজ বেগম দাবি করেন, ‘সন্তান হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এর মধ্যেই আমার অনুমতি ছাড়াই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি বলছেন আমি সম্মতি দিয়েছি, কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার বিশ্বাস, শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদানের টাকাই এই বিয়েতে ব্যয় করা হয়েছে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দ ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে তার স্বাক্ষর জাল করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া শহীদ ছেলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আব্দুল মতিন বলেন, ‘বংশ রক্ষার স্বার্থে এবং আমার মায়ের অনুরোধে দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিয়ের আগে আমার প্রথম স্ত্রী এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। এখন তিনি তা অস্বীকার করছেন। আমি চাকরি করি এবং নিজের উপার্জনের টাকায় বিয়ে করেছি। শহীদ ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করেছি, এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের পর পাঁচবার প্রথম স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাইনি। বর্তমানে বিষয়টি পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়েও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জুলাই সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নাকিব বলেন, ‘আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। তবে এমন সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেওয়া উচিত, যাতে পরিবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়। বিশেষ করে একজন জুলাই শহীদের পরিবারের ক্ষেত্রে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে শহীদদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘একজন জুলাই শহীদের বাবা হিসেবে মতিন সাহেবের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যথিত করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত মোটেও সমীচীন হয়নি। শহীদ পরিবারের প্রতি মানুষের যে সম্মান ও প্রত্যাশা রয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারী (শহীদ ও আহত সেল) আল নূর আয়াস বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। তাকে নিয়েই সংসার পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। এ ধরনের সিদ্ধান্ত শহীদ পরিবারের মর্যাদা ও মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’