
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও মূল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি প্রশাসন। উল্টো তথ্য গোপন, প্রচ্ছন্ন টালবাহানা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমকে সম্পূর্ণ ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছেন ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে তাঁর কার্যালয়ে নিজেদের কেনা নতুন তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শনিবার (১৬ মে) সকাল পৌনে ১০টার দিকে উপাচার্যের (ভিসি) বাসভবনের সামনে রাতভর চলা অবস্থান কর্মসূচি শেষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা এই কঠোর সিদ্ধান্ত জানান।
প্রক্টর কার্যালয় সিলগালা ও প্রশাসনিক ভবন অবরোধের ডাক
সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ের মূল দুটি দরজার আগের তালা ভেঙে সেখানে নতুন তালা লাগিয়ে দেন। আন্দোলনকারীরা সাফ জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আগামীকাল রোববার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবন পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফজিলাতুন্নেছা হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ফারজানা তাবাসসুম। তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন:
‘১২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার পরদিন ১৩ মে নারী শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে অপরাধীকে গ্রেপ্তারের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার রাত দুইটা থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা।’
‘প্রশাসনিক অসততা’ ও ছাত্রীদের ‘ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ
ফারজানা তাবাসসুম প্রশাসনের চরম নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে আরও উল্লেখ করেন যে, আলটিমেটামের নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মূল অপরাধী গ্রেপ্তার না হলে প্রক্টরিয়াল টিমের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ ছিল তাদের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু সময়সীমা পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত ১৩ মে উপাচার্য স্বয়ং উপস্থিত থেকে ছাত্রীদের সব দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং লিখিত কাগজে স্বাক্ষরও করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে, যাকে আন্দোলনকারীরা ‘প্রশাসনিক অসততা’ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘বেইমানি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
লিখিত বক্তব্যে প্রশাসনের শীর্ষ পদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়:
‘একজন উপাচার্যের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সত্য প্রকাশ করা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু আমরা দেখেছি, প্রশাসন বরং নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতেই ব্যস্ত থেকেছে।’
খোলা আকাশে রাতভর অবস্থান, অসুস্থ বেশ কয়েকজন
আন্দোলনকারী ছাত্রীরা জানান, গতকাল শুক্রবার রাত দুইটা থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেওয়ার কারণে বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী সারারাত জেগে ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এত কিছুর পরও সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা তাদের সাথে ইতিবাচক যোগাযোগ করেননি; উল্টো দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে অসংবেদনশীল আচরণ ও উদাসীনতা মিলেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভোর পর্যন্ত প্রক্টর তাদের সামনে আসেননি। পরবর্তীতে ভিসি ভবন থেকে বের হয়ে প্রক্টর আন্দোলনরত ছাত্রীদের সরাসরি ‘ষড়যন্ত্রকারী’ বলে সম্বোধন করেন। ছাত্রীদের ভাষ্যমতে, এমন বক্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং এটি মূলত একটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে নস্যাৎ ও হেয় করার অপচেষ্টা মাত্র। এই অচলাবস্থার নিরসন না হওয়া পর্যন্ত রোববার থেকে প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি সফল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সকালে হলে ফিরে যান শিক্ষার্থীরা।