
মেগাসিটির প্রাণকেন্দ্রে অত্যন্ত সুচতুর ও গোপনে জাল বুনেছিল কোকেনের এক বিশাল সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও সাইবার ট্র্যাকিং এড়াতে এই চক্রের সদস্যরা কোনো ধরনের সিমকার্ড ছাড়াই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া আনমোল ওরফে পিংকি নামের এক শীর্ষ নারী মাদক কারবারিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর এমন অভিনব ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এর গত বৃহস্পতিবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করাচি শহরজুড়ে এই সুসংগঠিত কোকেন সরবরাহ চক্রটির মূল হোতা ছিলেন এই পিংকি। ক্রেতা এবং মাদক সরবরাহকারী (রাইডার)—উভয় পক্ষের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে তিনি এক অভিনব ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
সিমহীন নেটওয়ার্ক ও ‘ত্রিভুজ’ আকৃতির নিখুঁত ছক
তদন্তকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিতে পিংকি ও তাঁর সহযোগীরা ফোনে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক বা সিমকার্ড ব্যবহার করতেন না। তাঁরা যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে কেবল ওয়াই-ফাই এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতেন। পুরো অপরাধ চক্রটি একটি ‘ত্রিভুজ’ আকৃতির সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে পরিচালিত হতো, যার নিয়ন্ত্রণ বা কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতেন পিংকি নিজেই।
গোয়েন্দারা জানান, এই চক্রের মাঠপর্যায়ের রাইডাররা কখনোই জানতেন না তাঁরা কার হাতে বা কার ঠিকানায় মাদক পৌঁছে দিচ্ছেন। একইভাবে ক্রেতারাও সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকতেন যে কার কাছ থেকে এই কোকেন আসছে। মাদক হাতবদলের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতো অগ্রিম অর্থ পরিশোধের ভিত্তিতে। প্রথমে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হতো। অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পিংকি রাইডারকে মাদক সরবরাহের চূড়ান্ত নির্দেশ দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে রাইডাররা আগে থেকে নির্ধারিত কোনো গোপন বা জনমানবহীন স্থানে কোকেনের প্যাকেট রেখে তার ছবি ও লোকেশন পিন পিংকিকে পাঠিয়ে দিতেন। পিংকি পরবর্তীতে সেই তথ্য ও ছবি পৌঁছে দিতেন মূল ক্রেতার কাছে।
কড়া ব্যাকআপ পরিকল্পনা: গ্রেফতার হলেই ‘ডিসকানেক্ট’
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেন, কোনো কারণে চক্রের কোনো সদস্য বা রাইডার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে, তার জন্য এই নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট ব্যাকআপ পরিকল্পনা বা রক্ষাকবচ ছিল। যদি কোনো রাইডার পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হতেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সার্ভার থেকে তাঁকে এই চক্র থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন (ডিসকানেক্ট) করে দেওয়া হতো। এমনকি ওই রাইডার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্ত হয়ে আসলেও তাঁকে আর কখনো এই ক্রাইম নেটওয়ার্কে ফিরিয়ে নেওয়া হতো না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই বিষয়ে বলেন, ‘পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার হেফাজতে যাওয়া কাউকেই এই চক্রের সদস্যরা আর বিশ্বাস করতেন না।’
এই কঠোর ও নির্মম কৌশলের কারণেই বিগত দিনে একের পর এক অভিযান বা গ্রেফতারের পরও এই চক্রের মূল কার্যক্রম এতদিন সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে চলেছে। তাছাড়া কোনো রাইডারের কাছে অন্য কোনো সহকর্মীর বিন্দুমাত্র তথ্য থাকত না। পুরো চেইনটি ওয়ান-টু-ওয়ান কেবল পিংকি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল ও গুলশানে জোহর থেকে সহযোগী গ্রেফতার
তদন্তের একটি সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি পিংকির অপরাধের ওপর নজরদারি বাড়ানোর বা তথ্য খোঁজার চেষ্টা করতেন, তবে পিংকি উল্টো বিভাগের কিছু অসৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও দুর্বলতা সংগ্রহ করতেন এবং পরবর্তীতে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চালাতেন। তবে পুলিশ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্পর্শকাতর অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
এদিকে গত বুধবার রাতে করাচির গুলশানে জোহর এলাকা থেকে পিংকির অন্যতম প্রধান সহযোগীসহ দুজনকে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আটক করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আটককৃত প্রধান ব্যক্তি মূলত এই চক্রের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেখাশোনা করতেন। কোকেন ক্রেতাদের পাঠানো টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করে এবং মোবাইল লোকেশন নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। এই চক্রের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে এবং বাকি সদস্যদের ধরতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।