
সরকারের ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণে বড় অগ্রগতির লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তাদের মতে, প্রায় সব প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকই বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সেখানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতি এখনো আগের কয়েক বছরের সঞ্চিত সংকট কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর সংস্কার ও শক্তিশালী নীতিগত পদক্ষেপ দরকার।’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং অন্যান্য গবেষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও বাস্তবতা
আগামী অর্থবছরে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ, আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে প্রবৃদ্ধিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে মনে করে সিপিডি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সংশয়
নতুন বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে উল্লেখ করে সিপিডি বলছে, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই সমাধান হবে না।
তাদের মতে, খাদ্য সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন, আমদানি প্রবাহ এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। সিপিডি আরও মনে করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে অন্যান্য সব অর্থনৈতিক লক্ষ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিনিয়োগে আস্থার সংকট
বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হলেও সিপিডি বলছে, বর্তমান পরিবেশ বিনিয়োগবান্ধব নয়। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, ডলারের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে আছে।
সংস্থাটি বলছে, কর ছাড় বা প্রণোদনা একা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো জরুরি।
রাজস্ব আহরণে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সিপিডির মতে, সাম্প্রতিক বছরের প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করলে এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
তাদের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত দুর্বলতা, কর ফাঁকি এবং সীমিত করজালের কারণে রাজস্ব আহরণ পিছিয়ে আছে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে কর তথ্য সংযুক্তকরণ, টিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং ডিজিটাল কর প্রশাসনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
ব্যাংক ঋণের ঝুঁকি
সিপিডির মতে, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। এটিকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব বলা হয়।
তাদের মতে, ব্যাংকিং খাত এখনো খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতিতে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রফতানি ও কর্মসংস্থান
সিপিডি বলছে, রফতানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরগতির মধ্যে রয়েছে। বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জও রফতানি খাতে ঝুঁকি তৈরি করছে।
এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করে সংস্থাটি। তাদের মতে, শ্রমবাজারে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রবেশ করলেও সেই তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
ইতিবাচক দিক
সমালোচনার পাশাপাশি বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে কর কাঠামোর জন্য পাঁচ বছরের রোডম্যাপ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, রফতানিমুখী শিল্পে বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর সুবিধা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি।
তবে সংস্থাটি বলছে, এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নীতি ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে।
বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
সিপিডির সামগ্রিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাজেটটি উচ্চাভিলাষী হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, রফতানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো লক্ষ্য অর্জনে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়।
তাদের মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারলেই বাজেটের লক্ষ্য বাস্তব রূপ পেতে পারে। না হলে এসব লক্ষ্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।