
আইন অনুযায়ী খালাস না হওয়া পণ্য রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু নিলামে বিক্রির পর যদি পণ্যভর্তি কনটেইনারই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়, তাহলে সেই পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে এমনই একাধিক ঘটনায় এখন তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের মার্চে চট্টগ্রাম বন্দরে ই-অকশনের মাধ্যমে একটি কনটেইনার ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। কনটেইনারটিতে ছিল ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি বা ৪৭৮ রোল ইনডিগো রঙের ফেব্রিক্স। বিডার পে-অর্ডার ও এ-চালানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পর পণ্য বুঝে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, কনটেইনারটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
দীর্ঘ সময়েও সরবরাহ সম্ভব না হওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রিত পণ্যের মূল্য ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তবে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিঠি চালাচালি চললেও কনটেইনারটির হদিস মেলেনি। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য বুঝে না পাওয়ার নজির তৈরি হয়েছে, যা বন্দর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি আরও দুটি কনটেইনার উধাও হওয়ার তথ্য মিলেছে। নিলামে অংশ নেওয়া বিডার শুল্কসহ সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেও এখনো পণ্য হাতে পাননি। সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ভেতর থেকে এভাবে পণ্য নিখোঁজ হওয়া বন্দর নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিলামের পরও কেন পণ্য হস্তান্তর করা যাচ্ছে না—এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, ‘বিডার সকল শুল্ক পরিশোধের পর কনটেইনার দিতে না পারায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটিও জানিয়েছে যে কনটেইনারটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বিডার অর্থ ফেরতসহ ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়া চলছে।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিবেদন পেলে নির্ধারণ করা হবে গাফিলতি কার ছিল। এরপর দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কনটেইনার যদি পাওয়া না যায়, তাহলে কে দায়ী— সেটা আগে নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি হয়েছে কি না, হলে কার কিংবা অন্য কোনো ডিপোতে কনটেইনার ভুলে চলে গেছে কি না— বিষয়গুলো নির্ধারণ করে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তির কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।’
নথিতে যা মিলেছে
কাস্টমস ও বন্দর সূত্রের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে ই-অকশনে বিক্রি হওয়া ওই ফেব্রিক্সভর্তি কনটেইনারটির বিড মূল্য ছিল ৮৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং ভ্যাট ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ টাকা যোগ হয়ে মোট মূল্য দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। বিডারের অনুকূলে ডিও ইস্যু হলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ অপারগতা জানায়।
পরবর্তীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিডারের পরিশোধিত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে। কাস্টমস সূত্র বলছে, পণ্য সরবরাহ না হওয়ায় সরকারও প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কাস্টমস আইন-২০২৩ অনুযায়ী আমদানি-রপ্তানি পণ্যের হেফাজতের দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। ওয়্যারহাউজে থাকা পণ্যের নিরাপত্তা, সঠিক সরবরাহ ও হেফাজত নিশ্চিত করার আইনগত দায়ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধিত পণ্য বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হলে দায় কার—তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
আরও দুটি কনটেইনারের রহস্য
২০২৫ সালের আগস্টে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি আরও দুটি কনটেইনার নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে নিলামে অংশ নিয়ে শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৭ টন কাপড়ভর্তি একটি কনটেইনার ৮৫ লাখ টাকায় কিনে নেয়। শুল্ক, নিলামমূল্য ও বন্দর চার্জসহ মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধের পর ট্রাক নিয়ে বন্দর ইয়ার্ডে গেলে জানানো হয়, কনটেইনারটি সেখানে নেই। প্রায় ১০ মাস পেরিয়েও এর কোনো সন্ধান মেলেনি।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য যদি বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যায়— এটা বন্দর কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। বিডার সব টাকা পরিশোধ করার পরও পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পারা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সরকারও প্রাপ্য রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় বিক্রি হওয়া পণ্য যদি রাষ্ট্রই ডেলিভারি দিতে না পারে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
দুদকের অভিযান, বাড়ছে উদ্বেগ
নিলামে বিক্রি হওয়া অন্তত দেড় কোটি টাকার দুটি কনটেইনার নিখোঁজের ঘটনায় গত ২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চট্টগ্রাম উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া যায়।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি টাকার বেশি মূলধন প্রায় সাত মাস ধরে আটকে থাকায় আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বারবার চিঠি দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছি না।’ তার আশঙ্কা, এ ধরনের ঘটনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে।