
দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার গ্লোব জনকণ্ঠ গ্রুপের বন্ধক রাখা সম্পদ নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। প্রায় ২১৫ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ উদ্ধারে ডাকা এই নিলামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রাজধানীর ১৫ তলা ‘জনকণ্ঠ ভবন’সহ গ্রুপটির বিভিন্ন সম্পদ। আদালতের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ নিলামে অংশ নিতে আগ্রহীদের ২৮ এপ্রিল দুপুর ২টার মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
নিলামসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীকে নির্ধারিত সংরক্ষিত মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। নিলামের সময় আদালতের বিধি অনুসারে দর আহ্বান করা হবে। তবে সম্পদ বিক্রির পর কোনো ধরনের জটিলতা বা বিরোধ দেখা দিলে তার দায় ব্যাংক বা আদালত নেবে না বলেও শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্লোব জনকণ্ঠ গ্রুপকে দেওয়া এই ঋণ নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা ছিল। ২০২০ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে গ্রুপটির জন্য ২৫০ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণের সুপারিশ করেন। সেখানে দাবি করা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গ্লোব জনকণ্ঠের অধীন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে। দুই মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকও এ ঋণের অনাপত্তি সনদ দেয়। ঋণের অর্থ ছাড় করা হয় জনতা ব্যাংকের দিলকুশা করপোরেট শাখা থেকে।
গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের আওতায় মোট আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে আছে গ্লোব মেটাল কমপ্লেক্স, গ্লোব ইনসেক্টিসাইডস, গ্লোব কেবলস, গ্লোব প্রিন্টার্স, জনকণ্ঠ, গ্লোব কনস্ট্রাকশন, গ্লোব খামার প্রকল্প ও গ্লোব টেকনোলজিস। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বর্তমানে কার্যত অচল। গত মার্চে দৈনিক ‘জনকণ্ঠ’ ছাপা সংস্করণ ও অনলাইন কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
গ্লোব জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য না দিলেও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান আর্থিক সংকটের গভীরতার কথা তুলে ধরেছেন। গত বছর দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি বলেন, ‘তাদের পাওনাদারের সংখ্যা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জন। সব সম্পত্তিই ব্যাংকে বন্ধক রাখা আছে। দীর্ঘদিন ধরে আয়কর দেওয়া হচ্ছে না। এর ওপর রয়েছে বিশাল ব্যাংকঋণ। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের টিকে থাকা খুবই কঠিন।’
এদিকে বড় বড় করপোরেট ঋণ খেলাপির চাপে জনতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও চাপে রয়েছে। বেক্সিমকো, এস আলম, থার্মেক্স গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপসহ কয়েকটি বড় গ্রুপের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। গত বছরের শেষ দিকে ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, যার প্রায় ৭৪ শতাংশই খেলাপি বা মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য প্রথমেই নিলামের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়। তবে নিলামে সব সময় ভালো সাড়া মেলে না। ছোট ঋণের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সাড়া পাওয়া যায়। এভাবে টাকা আদায় সম্ভব না হলে আইনের বিধান অনুযায়ী মামলা করতে হয়।’
তিনি আরও জানান, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প উপায়েও ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলছে। গত বছর জনতা ব্যাংক প্রায় ৯০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।