
ম্যাক কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের এক দুর্দান্ত সুযোগ নিয়ে এলো প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। প্রতিষ্ঠানটি ম্যাকওএস (macOS) প্ল্যাটফর্মের জন্য তাদের নতুন অন-ডিভাইস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম ‘এআই এজ গ্যালারি’ উন্মোচন করেছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা এখন ক্লাউড বা ইন্টারনেট ছাড়াই সরাসরি নিজেদের কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে এআই মডেল পরিচালনা করতে পারবেন।
সাধারণত চ্যাটজিপিটি, ক্লড কিংবা জেমিনির মতো জনপ্রিয় এআই সেবাগুলো ক্লাউড বা অনলাইন সার্ভারের ওপর ভিত্তি করে চলে। কিন্তু অন-ডিভাইস বা স্থানীয় (লোকাল) এআই মডেলগুলো সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যবহারকারীর নিজস্ব ডিভাইসের ভেতরেই কাজ সম্পন্ন করে। এর ফলে অফলাইনেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সব সুবিধা উপভোগ করা যায় এবং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল কোনো ডেটা বাইরের কোনো সার্ভারে যায় না, যা তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করে।
অন-ডিভাইস এআই ব্যবহারের সুবিধা
অন-ডিভাইস বা লোকাল এআই মডেলগুলো আকারে ক্লাউডভিত্তিক বৃহৎ মডেলগুলোর চেয়ে ছোট হলেও এগুলোর কার্যকারিতা অনন্য। ব্যবহারকারীরা নেটওয়ার্কহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অফলাইনে কাজ করতে পারেন, কম্পিউটারের নিজস্ব শক্তিশালী হার্ডওয়্যার ব্যবহারের ফলে তাৎক্ষণিক ও দ্রুত রেসপন্স পাওয়া যায় এবং ডেটা লিক হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না।
এতদিন পর্যন্ত অ্যাপল ম্যাক ব্যবহারকারীরা লোকাল এআই মডেল চালানোর জন্য ওলামা (Ollama) কিংবা এলএম স্টুডিও (LM Studio)-র মতো থার্ড-পার্টি বা তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করতে হতো। গুগলের এই নতুন প্ল্যাটফর্ম সেই নির্ভরতা দূর করল।
পাঁচটি জেমা মডেল দিয়ে শুরু
প্রাথমিক পর্যায়ে গুগলের এই এআই এজ গ্যালারিতে তাদের নিজস্ব ‘ইনস্ট্রাকশন-টিউনড’ (Instruction-tuned) জেমা সিরিজের পাঁচটি মডেল যুক্ত করা হয়েছে। ওলামা বা এলএম স্টুডিওর মতো অন্যান্য ডেভেলপারদের তৈরি মডেলগুলো সমর্থন না করে, এই অ্যাপটি আপাতত সম্পূর্ণভাবে গুগলের নিজস্ব জেমা মডেলগুলোর ওপর ভিত্তি করেই সাজানো হয়েছে।
বাজারে এলো শক্তিশালী মাল্টিমোডাল ‘জেমা ৪ ১২বি’
এআই এজ গ্যালারি উদ্বোধনের পাশাপাশি গুগল ‘জেমা ৪ ১২বি’ (Gemma 4 12B) নামে একদম নতুন একটি মাল্টিমোডাল এআই মডেলের পর্দা উন্মোচন করেছে। গুগলের দাবি, ১২ বিলিয়ন প্যারামিটারের এই ছোট আকৃতির মডেলটি ২৬ বিলিয়ন প্যারামিটারের অনেক বড় ও ভারী মডেলের সমমানের পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম।
মডেলটির বড় সুবিধা হলো, এটি মাত্র ১৬ জিবি র্যাম সমৃদ্ধ সাধারণ মানের ল্যাপটপেই অনায়াসে চালানো যাবে। এই মাল্টিমোডাল মডেলটি একাধারে টেক্সট, ছবি ও অডিও প্রসেস করতে পারে, যা কনটেন্ট তৈরি, সফটওয়্যার কোডিং এবং জটিল ডেটা বিশ্লেষণের মতো কাজে দারুণ গতি আনবে।
ভয়েস টু টেক্সটের জন্য নতুন অ্যাপ ‘এআই এজ এলোকুয়েন্ট’
ম্যাক ব্যবহারকারীদের চমকে দিয়ে গুগল ‘এআই এজ এলোকুয়েন্ট’ (AI Edge Eloquent) নামে আরেকটি নতুন ডিকটেশন অ্যাপও বাজারে ছেড়েছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য এই অ্যাপটি মূলত ব্যবহারকারীর কণ্ঠস্বর বা কথাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিখুঁত লিখিত টেক্সটে রূপান্তর করে। শুধু তা-ই নয়, কথা বলার সময় মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া অপ্রয়োজনীয় শব্দ বা জড়তা নিজে থেকেই ছেঁটে ফেলে লেখাকে প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এই অ্যাপের সমস্ত প্রসেসিং বা ডেটা বিশ্লেষণ কম্পিউটারের ভেতরেই সম্পন্ন হওয়ায় তথ্যের শতভাগ নিরাপত্তা বজায় থাকে। এছাড়া ব্যবহারকারীরা তাদের রুচি অনুযায়ী লেখার আউটপুট কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে পারবেন এবং বিশেষ কোনো নাম, কারিগরি শব্দ বা নির্দিষ্ট পেশাগত খাতের পরিভাষাও অ্যাপের ডিকশনারিতে যুক্ত করে নিতে পারবেন।
অন-ডিভাইস এআই-এর দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গুগলের এই পদক্ষেপটি বৈশ্বিক টেক ইন্ডাস্ট্রির একটি বড় পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। বর্তমানে ক্লাউড বা ইন্টারনেট ডাটানির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ব্যক্তিগত ডিভাইসেই এআই চালনার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে কোম্পানিগুলো।
বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের হার্ডওয়্যারের ক্ষমতা দিন দিন যত বাড়ছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা, অতি দ্রুত সেবা প্রদান এবং ইন্টারনেটহীনতা দূর করার লক্ষ্যে অন-ডিভাইস এআই প্রযুক্তির পেছনে বিনিয়োগ তত বাড়াচ্ছে।
উলেখ্য, গুগলের এই ‘এআই এজ গ্যালারি’ প্ল্যাটফর্মটি এর আগেই অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস (iOS) সংস্করণে সচল ছিল, যা এবার ম্যাকওএস ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত হলো। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি অন-ডিভাইস এআই টুলের এই পরিধি আরও বড় করবে বলে আভাস পাওয়া গেছে।