
যুদ্ধবিধ্বস্ত উত্তর গাজার শিশুদের সাংবাদিকতা শেখানোর পাশাপাশি তাদের সংগ্রহ করা সংবাদ আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের রিমোট প্রডিউসার মোহাম্মদ আরিফুর রহমান শিবলী। আন্তর্জাতিক শিশু গণমাধ্যম ‘চাইল্ড মেসেজ ইংলিশ’-এর হয়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গাজার স্থানীয় শিশু সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের কাজ করেছেন। একই সঙ্গে কর্মজীবনে প্রথমবারের মতো গাজা থেকে দূরবর্তীভাবে সংবাদ প্রযোজনার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
আরিফুর রহমান জানান, গাজা যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে অবস্থান করেই তিনি শিশু সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতিবেদন নির্বাচন, অ্যাসাইনমেন্ট নির্ধারণ, স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত এবং সম্প্রচারের সময়সূচি ঠিক করার মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন আল জাজিরা আরবি বিভাগের ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা। তাদের সহায়তায় শিশু সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনার কাজ করতেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচারের জন্য প্রস্তুত করা হতো ইংরেজি সাবটাইটেল।
শিশুদের দিয়েই সাংবাদিকতার যাত্রা
উত্তর গাজার স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন সাহসী শিশুকে নিয়ে শিশু সাংবাদিকতা প্রকল্প শুরু করা হয়। প্রকল্প সমন্বয়ক খালেদের উদ্যোগে ২০২৩ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ২১ জন শিশু এতে আগ্রহ দেখায়। সেখান থেকে সম্প্রচারের জন্য নির্বাচিত হয় দিয়ালা হামাদ, শহীদ মোহাম্মদ সালা, আহমেদ আবু দাইয়া, আহমাদ সালাম ও মারিয়াম সালা আবদি। তাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এবং সবাই উত্তর গাজার বাসিন্দা।
ভাষাগত বাধা শুরুতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিনের প্রধান ভাষা আরবি হওয়ায় যোগাযোগ নিয়ে শঙ্কা থাকলেও পরে বিভিন্ন এআইভিত্তিক ভাষা-সহায়ক টুল ব্যবহার করে শিশু সাংবাদিক ও স্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন আরিফ।
ক্ষুধা, হাসপাতাল ধ্বংস ও পানির সংকট তুলে ধরেছে শিশুরা
এই প্রকল্পের আওতায় শিশু সাংবাদিক দিয়ালা হামাদের করা স্থানীয় শিশুদের অনাহার, শিশু হাসপাতাল ধ্বংসসহ বিভিন্ন প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘চাইল্ড মেসেজ’-এর এসব প্রতিবেদন বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভিতেও সম্প্রচার করা হয়েছে।
আরিফ বলেন, তিনি ঢাকা থেকে স্টোরি নির্বাচন, স্ক্রিপ্ট লেখা, অ্যাসাইনমেন্ট নির্ধারণ এবং সম্প্রচারের সময় ঠিক করতেন। অন্যদিকে গাজায় থাকা সাংবাদিকরা শিশুদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনায় সহায়তা করতেন।
সহকর্মী শিশু সাংবাদিকের মৃত্যু নাড়া দেয়
এই প্রকল্পে কাজ করার সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার একটি ছিল শিশু সাংবাদিক মোহাম্মদ সালার মৃত্যু। আরিফ জানান, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল ইসরায়েলি গুলিতে সালা নিহত হন।
তার ভাষ্য, ২৬ এপ্রিল রাতে পরবর্তী সম্প্রচারের জন্য কোন শিশুকে দায়িত্ব দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশ সময় রাত দেড়টার দিকে প্রকল্প সমন্বয়ক খালেদের কাছ থেকে তিনি মোহাম্মদ সালার নিহত হওয়ার খবর পান। এই সংবাদ তাকে গভীরভাবে শোকাহত করে।
সালার মৃত্যুর পর শিশু সাংবাদিক আহমেদ আবু দাইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি গাজার পানির সংকট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন।
যুদ্ধের মধ্যেও চলেছে রিমোট প্রডিউসিং
গাজা থেকে দূরবর্তীভাবে সংবাদ প্রযোজনার সময় নানা প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান আরিফ। বিদ্যুৎ ও মোবাইল চার্জের সংকটের কারণে অনেক সময় শিশু সাংবাদিক কিংবা প্রকল্প সমন্বয়কের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কখনো যোগাযোগের জন্য ক্যাম্পের বাইরে যেতে হতো।
তিনি বলেন, এমনও হয়েছে টানা তিন দিন কোনো শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তখন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতো। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মোবাইল যোগাযোগের নিরাপত্তাও ছিল বড় একটি বিষয়। তাই পুরো প্রকল্পে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পর মাঠে শিশু সাংবাদিকরা
যুদ্ধের মধ্যেও শিশু সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরিফ জানান, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মূল গুরুত্ব ছিল তাদের প্রশিক্ষণের ওপর। আল জাজিরা আরবি বিভাগের সাংবাদিকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা শেখাতে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।
নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টের আগে শিশু সাংবাদিকদের জন্য হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা করা হতো।
গাজা থেকে আবারও সম্প্রচারের পরিকল্পনা
গাজা থেকে শিশু সাংবাদিকদের প্রতিবেদন আবারও সম্প্রচার শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন আরিফুর রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ বিভাগ এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যতে গাজা থেকে শিশু সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রতিবেদন আবারও সম্প্রচার করা হতে পারে।
আরিফের কাছে এই কাজ শুধু সংবাদ প্রযোজনা নয়, বরং যুদ্ধের মধ্যে থাকা শিশুদের কণ্ঠ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তার স্বপ্ন, একদিন তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো শিশু সাংবাদিক ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেবে।
“আমি স্বপ্ন দেখি, কোনো এক স্টোরিতে আমার শিশু সাংবাদিক ফিলিস্তিনকে দখলদারত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সংবাদ বিশ্বকে দেখাবে—এটাই আমার স্বপ্ন,” বলেন আরিফুর রহমান।