
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের সময় চরম অসদাচরণ ও আপত্তিকর আচরণের অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের তিনজন জ্যেষ্ঠ নারী অতিরিক্ত ডিআইজি কড়া শাস্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, আজ-কালের মধ্যেই তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা বর্তমানে ডিএমপি, সিআইডি এবং নৌপুলিশে দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।
একই সাথে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়মে সহায়তাদান, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন চালানো এবং ব্যাপক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আরও ১৭ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক অবসরের সেই খসড়া তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তালিকায় ৩ জন ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক), ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ১ জন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ১ জন উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন।
নথিতে অভিযুক্ত সকল কর্মকর্তাকে ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, এই কর্মকর্তারা বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়ম, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন, অবৈধ গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে তালিকার তিন নারী কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানোর সময় সরাসরি হেনস্তা ও অশোভন আচরণ করার সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইডিতে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা এবং নৌপুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি জেসমিন বেগম সম্পর্কে নথিতে বলা হয়েছে, ‘সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে টেনেহিঁচড়ে বাসা থেকে উচ্ছেদ করেন।’
নথিতে জেসমিন বেগমকে সাবেক বিতর্কিত ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে তাঁর অফিসিয়াল মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা সম্পর্কে নথিতে দাবি করা হয়, তাঁর মাধ্যমে রাষ্ট্রের অতিসংবেদনশীল গোপন তথ্য আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পাচার হচ্ছে। তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সাহারা খাতুনের আস্থাভাজন সহযোগী ছিলেন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা জানান:
‘আপনারা ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বুঝবেন, আমি ওনাকে (খালেদা জিয়া) গ্রেপ্তারের সময় ওখানে ছিলাম না। এখন পদোন্নতির সময় হয়েছে, তাই একটি চক্র এমন ভিত্তিহীন খবর ছড়াচ্ছে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘২০১৮ সালের অবৈধ মামলার রায় ঘোষণার পর তার নিজ দায়িত্বে সাবেক ৩ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে গাড়িতে উঠিয়ে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় তিনি একই গাড়ির দ্বিতীয় সিটে অবস্থান করেন। এ বিষয়ে তৎকালীন ডিএমপির অফিসারদের কাছ থেকে বাহবা পান এবং সবাই তার প্রশংসা করেন।’
বর্তমানে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (হেডকোয়ার্টার্স) পদে দায়িত্ব পালন করা ফরিদা ইয়াসমিনের সাথে বেশ কয়েকবার সরকারি ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
বাধ্যতামূলক অবসরের প্রস্তাবিত তালিকায় থাকা অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হলেন— ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকী, ডিআইজি ওয়ালিদ হোসেন ও ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান।
এছাড়া অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম ইকবাল হোসেন, মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন, বিধান ত্রিপুরা, সহেলী ফেরদৌস, ফয়সাল মাহমুদ, হাসিনা রহমান, কানিজ ফাতেমা ও সুলতানা নাজমা হোসেন এবং পুলিশ সুপার আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী ও উপপুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানও বাধ্যতামূলক অবসরের এই তালিকায় রয়েছেন।