
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চলে বাণিজ্যিক আম চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আমের বাগান গড়ে উঠছে, যা একদিকে উদ্যোক্তাদের লাভবান করছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের জন্য তৈরি করছে নতুন কর্মসংস্থান। স্বল্প খরচে বেশি ফলন পাওয়ায় এই অঞ্চলে আম চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হচ্ছে।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়। ওই বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই পরিমাণ জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এতে প্রায় ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলায় বর্তমানে আম্রপালি, বারি-৪, বারি-১১, হাড়িভাঙা, রাংগুয়াই, গৌরমতি, বানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, কাটিমন, মল্লিকা, চিয়াংমাই, মিয়াজাকি (সূর্যডিম), আশ্বিনা, ফজলি, কিং অব চাকাপাতসহ নানা জাতের আম চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে আম্রপালি (৩২১০ হেক্টর), যার সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ৪৩ হাজার ৮১০ মেট্রিক টন। বারি-৪, রাংগুয়াই, বানানা ম্যাঙ্গোসহ অন্যান্য জাতের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, পাহাড়ের জমি অনাবাদি না রেখে এখন বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের সহায়তায় ফলনও বাড়ছে। ফলে অনেকেই নতুনভাবে আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা মো. ফোরকান উদ্দিন পাহাড়ি পাঁচ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বহুজাতিক জাতের আমের বাগান। ২০২৩ সালে শুরু করা এই উদ্যোগে এখন প্রায় দুই হাজার আমগাছ রয়েছে। তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে পাহাড়ে আম চাষ অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, শখ থেকে শুরু করলেও এখন এটি বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি মাটি ও আবহাওয়া উন্নত জাতের আম চাষের জন্য উপযোগী। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা থাকলে সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
একই এলাকার আরেক বাগান মালিক রূপক বলেন, আগে পাহাড়ি জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিতে আমসহ নানা ফল চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা বাড়লে এ খাতে আরও অগ্রগতি সম্ভব।
বাগানে কর্মরত শ্রমিক মো. জগদীশ ত্রিপুরা জানান, নিয়মিত কাজের সুযোগ পাওয়ায় তাদের পরিবারের আয় বেড়েছে এবং জীবিকা সহজ হয়েছে। বাগানগুলো স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি উপপরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের জলবায়ু আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের আম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে খাগড়াছড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে পাহাড়ি জনপদে আম চাষ শুধু কৃষি উৎপাদনই নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।