
রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বর্ধিত আস্থা ও নতুন দিক-নির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শিল্পায়নের ক্ষেত্রেই নিহিত। চীনের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এজন্য উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, চীনের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ এবং কৃষিভিত্তিক মূল্য সংযোজন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে।
ড. তিতুমীর আরও বলেন, বাংলাদেশি পেয়ারা ও কাঁঠালের জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত হওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। ভবিষ্যতে আরও সম্ভাবনাময় দেশীয় পণ্যের জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিভিন্ন শিল্পখাতে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প স্থানান্তর এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে চায়।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, রেল যোগাযোগের উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, আধুনিক মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
কুনমিং-চট্টগ্রাম মাল্টিমোডাল পরিবহন করিডোর এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান তিনি।
জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ড. তিতুমীর বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
তিনি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীশাসন, ড্রেজিং প্রযুক্তি এবং পানি ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা যেতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বেইজিংয়ের সক্রিয় ভূমিকা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের প্রসঙ্গ টেনে ড. তিতুমীর বলেন, ওই সফরের অন্যতম বড় অর্জন হলো বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। এখন এই সম্পর্কের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের মূল ভিত্তি হবে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
সেমিনারে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, গবেষক, চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।