
চাকা নেই, ইঞ্জিন নেই, ব্যাটারির ঝকঝকে আলোও নেই। অথচ দুই শিশুর চোখে সেটিই যেন রাজকীয় বাহন। সুপারি গাছের শুকনো খোলের ওপর বসা দুই শিশু, সামনে সুপারি পাতার গোছা ধরে টানছে তাদের মা। মাটির উঠোনজুড়ে ছুটছে সুপারির খোলের গাড়ি , সঙ্গে ছুটছে দুই শিশুর নির্মল হাসি। আধুনিক খেলনা আর মোবাইলের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সেই সহজ-সরল শৈশবই যেন ফিরে এসেছে কিশোরগঞ্জের যশোদল বানিয়াকান্দি গ্রামে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকালে বানিয়াকান্দি গ্রামের বাড়ির উঠোনে এমনই আনন্দের খেলায় মেতে ওঠে দুই শিশু সুবাইতা রাইছা আরশি ও উম্মে উমারা রিন্তাহা। তাদের খেলনার নাম সুপারির খোল। প্রকৃতি থেকে পাওয়া একটি শুকনো সুপারি খোলই তাদের কাছে হয়ে উঠেছে আনন্দের বাহন।
গ্রামবাংলায় একসময় সুপারি গাছের শুকনো খোল, কলাগাছের ভেলা, মাটির পুতুল, কঞ্চির গাড়িসহ নানা দেশীয় উপকরণ দিয়ে শিশুদের খেলাধুলার প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে আধুনিক খেলনা, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে সেই খেলাগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে বানিয়াকান্দির এই দুই শিশুর খেলায় যেন দেখা মিলেছে হারিয়ে যেতে বসা সেই শৈশবের।
রিন্তাহা ও আরশির মা শিরিন আফরোজ বলেন, বর্তমান সময়ের আধুনিক খেলনা ও মোবাইলের আসক্তি থেকে ওদের দূরে রাখতে আমি আমাদের ফেলে আসা শৈশবের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেষ্টা করি। ওরাও ছোটবেলা থেকেই দেশীয় উপকরণ দিয়ে খেলতে বেশি পছন্দ করে। সুপারি গাছের খোল পড়ে থাকতে দেখলেই সেটি নিয়ে খেলতে শুরু করে। মোবাইল বা দামি খেলনার পেছনে সারাক্ষণ না থেকে এভাবে বাইরে খেলাধুলা করলে ওদের মনও ভালো থাকে, শরীরও ভালো থাকে।
আরেক শিশুর মা সুমাইয়া আক্তার হাওয়া বলেন, বর্তমানে শিশুদের শৈশব অনেকটাই বদলে গেছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব, ভিডিও গেমস ও নানা ধরনের প্লাস্টিকের খেলনা। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলা কিংবা নিজেরাই খেলনা তৈরি করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এই ধরনের খেলাধুলা শিশুদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শৈশবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও তৈরি করে।
ছবিতে দেখা যায়, সামনে বসা শিশুটি সুপারি পাতার গোছা শক্ত করে ধরে আছে। পেছনে বসা শিশুটির মুখে নির্মল হাসি। চারপাশে নেই কোনো দামি খেলনা, নেই প্রযুক্তির ব্যস্ততা। আছে শুধু মাটির উঠোন, প্রকৃতির উপকরণ আর দুই শিশুর বন্ধুত্ব।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিরা সুলতানা বলেন, শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে খোলা জায়গায় প্রকৃতির উপকরণ নিয়ে খেলাধুলা শিশুদের সৃজনশীলতা, শারীরিক সক্ষমতা ও সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি শিশুদের অতিরিক্ত আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের এমন আনন্দদায়ক ও শারীরিক পরিশ্রমের খেলায় উৎসাহিত করা উচিত।
রিন্তাহা ও আরশির সুপারির খোলের বাহন তাই শুধু একটি শিশুখেলার দৃশ্য নয়। এটি গ্রামবাংলার সহজ জীবন, প্রকৃতিনির্ভর শৈশব এবং হারিয়ে যেতে বসা লোকজ খেলাধুলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আনন্দের জন্য যে সব সময় দামি খেলনা কিংবা মোবাইলের প্রয়োজন হয় না, বানিয়াকান্দির এই দুই শিশু যেন সেই কথাটিই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।