
বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের একটি অংশের মাঝে সমাজ ও রাষ্ট্রের শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তিদের অবজ্ঞা বা অসম্মান করার এক নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত। তিনি মনে করেন, এই আচরণকে এখন এক ধরনের ‘সাহসিকতা’ বা ‘স্মার্টনেস’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
আজ শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশন’ (আইসিএফ) নামক একটি নতুন সংগঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের আমলে দেশে দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রহীনতার চর্চা চলায় আমাদের সমাজের ঐতিহ্যগত ও সামাজিক মূল্যবোধের যে মজবুত কাঠামো ছিল, তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এর ফলে বর্তমান সমাজে দুর্নীতি এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে। মানুষ এখন আর পারিবারিক কিংবা সামাজিক আড্ডায় দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবাদ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, কারণ এসব সমাবেশেও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফলে এই সামাজিক অবক্ষয় ঠেকানো দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কেবল কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল—এই সাধারণ জ্ঞানটুকু দিয়ে নাগরিক জীবনে বড় কোনো রূপান্তর সম্ভব নয়। এর জন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও যাপনপদ্ধতিতে একটি দৃশ্যমান এবং সুদূরপ্রসারী সংস্কার দরকার।
যত্রতত্র থুতু কিংবা পানের পিক ফেলার মতো নেতিবাচক নাগরিক অভ্যাসের উদাহরণ টেনে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই আচরণগত ত্রুটিগুলো দূর করতে শাস্তির চেয়ে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা বেশি জরুরি। তরুণদের একাংশের মধ্যকার এই বিভ্রান্তি দূর করে সত্য ও মিথ্যার প্রকৃত সংজ্ঞা সমাজে ফিরিয়ে আনতে ‘ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশন’ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচলিত ধারণা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে ড. এমএ মুহিত বলেন, আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি বলতে সাধারণত বড় বড় হাসপাতাল তৈরি বা আইসিইউ বেড বাড়ানোকেই মনে করা হয়, যা আসলে এক ধরনের অসুস্থ মানসিকতা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের ‘সুস্বাস্থ্য’ বা সুস্থতা নিশ্চিত করা, শুধু অসুখের চিকিৎসা করা নয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বর্তমান বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শত শত কোটি টাকা ঢেলে উপজেলা পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ বা আইসিইউ বেড বসালেই প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন আইনি সুশাসনের মাধ্যমে খাদ্যকে সম্পূর্ণরূপে বিষ ও ভেজালমুক্ত করা এবং জনগণের সচেতনতা বাড়ানো। নাগরিকরা যদি প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করেন এবং খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হন, তবেই দেশের বড় বড় ঘাতক ব্যাধি যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও কিডনি রোগ সহজে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে এবং অকাল মৃত্যু হ্রাস পাবে।
রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নকে সফল করতে তরুণ সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবরুদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক আন্দোলনই ছিল একমাত্র পথ। কিন্তু বর্তমান স্থিতিশীলতার যুগে শুধু বিরোধিতার রাজনীতি পরিহার করে যুবসমাজের অফুরন্ত শক্তিকে একটি নতুন ইতিবাচক সামাজিক নীতিতে রূপান্তর করতে হবে। এই সামাজিক আন্দোলনে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব তরুণকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি উন্নয়ন কর্মসূচি জনসম্পৃক্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
এছাড়াও সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, জাতীয় গ্ৰন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম এবং নবগঠিত সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফেল জমির প্রমুখ। অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে নতুন এই সংগঠনের লক্ষ্য ও কার্যক্রমের ওপর নির্মিত দুটি তথ্যচিত্র (ভিডিও ডকুমেন্টারি) প্রদর্শন করা হয়।