
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারামুক্তির পথ অবশেষে পুরোপুরি উন্মুক্ত হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা পৃথক দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার (১৭ মে) আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক ‘নো অর্ডার’ (কোনো আদেশ নয়) প্রদান করেন। এর ফলে দুটি হত্যা মামলাসহ সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে থাকা মোট ১২টি মামলার সবকটিতেই জামিন বহাল রইল।
সিদ্ধিরগঞ্জের মামলা ও আজকের আইনি সমীকরণ
আইনি নথির বিবরণ অনুযায়ী, এর আগে ১০টি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর আইভীকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এই দুটি হত্যা মামলায় নতুন করে শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। এর মধ্যে গত ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
পরবর্তীতে ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট এক আদেশে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এই দুই মামলায় রুল জারিসহ আইভীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। এই জামিন ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আপিল করে, যা আজকের কার্যতালিকায় ৪১ ও ৪২ নম্বর ক্রমিকে শুনানির জন্য ওঠে। চেম্বার আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় আইভীর জামিন বহাল থাকে।
আজ আদালতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু এবং আইনজীবী এস এম সিদ্দিকুর রহমান। তাঁদের সাথে সহায়তায় ছিলেন আইনজীবী এস এম হৃদয় রহমান। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন।
বাকি ১০ মামলার জটিলতা যেভাবে কাটল
বিগত বছরের ৯ মে ভোররাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার নিজস্ব বাসভবন থেকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে প্রথম গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক আটকের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ প্রথম দফায় মোট ৫টি মামলায় তাঁকে যুক্ত করা হয়। গত বছরের ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট এই পাঁচ মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করলেও রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কারণে ১২ নভেম্বর চেম্বার আদালত তা স্থগিত করে নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। পরবর্তীতে গত ১০ মে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল খারিজ করে দিলে এই পাঁচ মামলায় আইভীর জামিন চূড়ান্তভাবে বহাল হয়।
তবে প্রথম দফার পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পরপরই, গত বছরের নভেম্বরে আইভীকে আরও ৫টি নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি ছিল ফতুল্লা থানায় দায়ের করা হত্যা মামলা এবং অপরটি নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলা।
দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরুদ্ধেও আপিল করলে গত ৫ মার্চ চেম্বার আদালত জামিন স্থগিত করে বিষয়টি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। অবশেষে গত ১০ মে আপিল বিভাগ পূর্বের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়ে হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এর ফলে দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলাতেও আইভীর জামিন কার্যকর হয়।
সাবেক মেয়রের অন্যতম প্যানেল আইনজীবী এস এম হৃদয় রহমান গণমাধ্যমকে সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে বলেন, ‘১২ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনাদেশ ও জামিন বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশে কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই প্রক্রিয়া শেষে চলতি সপ্তাহে তিনি মুক্তি পেতে পারেন বলে আশা করছি।’