
দীর্ঘ আলোচনার পর সব আপত্তি পেছনে ফেলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের এই দলটির ভেতরে মতভেদ থাকলেও শনিবার গভীর রাতে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের আলোচনায় ঐকমত্য গড়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সংস্কার প্রশ্নকে সামনে রেখেই এই সমঝোতা, যার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আজ রোববার আসতে পারে।
জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে এনসিপির ভেতরে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ২১৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য শনিবার রাতে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে চিঠি দিয়ে জোট না করার অনুরোধ জানান। পরে তারা ভিন্ন বক্তব্য দেন।
এদিকে জামায়াত ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গে আসন বণ্টনের আলোচনা প্রায় শেষ করেছে। দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, দুই শতাধিক আসনে প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত। আলোচনায় এনসিপিকে ৩০টি এবং ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫টি আসন দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
জোটের বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন শনিবার রাতে বলেন, ‘জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের মতভিন্নতা রয়েছে। জামায়াত ও এনসিপি মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে জোটের বা সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে আমরা সংস্কারকে মূল্যায়ন করছি।’
আসন বণ্টনের আলোচনায় থাকা দলগুলোর সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আট দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক আজ রোববার অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে এনসিপি ছাড়াও এবি পার্টি, এলডিপি ও লেবার পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে। বিএনপির কাছ থেকে প্রত্যাশিত আসন না পাওয়ায় এলডিপি ও লেবার পার্টি জামায়াতের জোটে এসেছে। আরও কয়েকটি দল যোগ দিতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
নেতাদের একাধিক সূত্র জানায়, শনিবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কার্যালয়ে ইসলামী আন্দোলন, মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বৈঠক হয়। পরে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। এর আগে শনিবার ভোররাত পর্যন্ত এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা জামায়াত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। সেখানে এবি পার্টির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। সময় দুই দিন বাড়ানোর বিষয়ে এনসিপি শনিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছে এবং আজ আনুষ্ঠানিক আবেদন জানাতে পারে।
বৈঠকসূত্রে জানা গেছে, যেসব আসনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট দলগুলো সরাসরি মনোনয়নপত্র জমা দেবে। যেসব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি, সেখানে আগ্রহী সব দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দেবেন। যাচাই-বাছাই শেষে জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে চারটি দল আগ্রহী হওয়ায় সবার প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেবেন। পরে জরিপে যে প্রার্থী এগিয়ে থাকবেন, তিনিই জোটের প্রার্থী হবেন এবং অন্যরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তপশিল অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হবে। ওই দিন পর্যন্ত আসন সমঝোতার সুযোগ থাকবে। মগবাজারের বৈঠকে উপস্থিত আরেক নেতা জানান, যেসব আসনে একাধিক প্রার্থী থাকবে, তারা আগেই প্রত্যাহারের চিঠি দিয়ে রাখবেন এবং ২০ জানুয়ারির মধ্যে জোটের একক প্রার্থী ছাড়া অন্যদের সরিয়ে নেওয়া হবে।
জামায়াতকে এনসিপি দুটি প্রার্থীতালিকা দিয়েছে। একটিতে ৫০ জন এবং অন্যটিতে ৩০ জনের নাম রয়েছে। এনসিপির শরিক এবি পার্টিও আলাদা তালিকা দিয়েছে। বৈঠকসূত্র জানায়, এনসিপি জরিপ পদ্ধতিতে রাজি নয়। তারা চায়, দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আসন ছেড়ে দেওয়া হোক। তবে এনসিপি ছাড় দেওয়া আসনের বাইরেও প্রার্থী দিতে আগ্রহী। জামায়াতের শর্ত অনুযায়ী, এনসিপিকে যদি ৩০টি আসন দেওয়া হয়, তাহলে বাকি ২৭০ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে এনসিপির কোনো প্রার্থী থাকতে পারবে না।
বৈঠকে এনসিপি নেতারা বলেন, ঘোষিত ১২৫ প্রার্থীর অনেকেই মাঠে কাজ শুরু করেছেন। তাদের সরিয়ে নিলে দল ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হবে এবং অনেকে রাজনীতি ছাড়তে পারেন। তাই কিছু প্রার্থীকে জোটের বাইরে থেকেও নির্বাচনে থাকার সুযোগ দিতে চান তারা। এনসিপি যে ৩০টি আসন চেয়েছে, তার কয়েকটি ছাড়তে জামায়াত রাজি নয়। আবার এনসিপি যে আসনগুলো চায়নি, তার কিছু দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে জামায়াত।
উল্লেখ্য, এনসিপি প্রথমে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার চেষ্টা করেছিল। বিএনপি চারটির বেশি আসন ছাড়তে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যায় দলটি।
ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯৪টি আসনের অনেক জায়গায় জামায়াত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং সেসব আসন শরিকদের দিতে চায়। তবে উত্তরবঙ্গ, খুলনা বিভাগ, সিলেটের কিছু অংশ, দক্ষিণ কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের যেসব আসনে জামায়াত শক্তিশালী, সেখানে ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। খেলাফত মজলিসের এক নেতা বলেন, জামায়াত যেখানে দুর্বল, সেখানে জোট করে লাভ নেই।
এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দাঁড়িপাল্লার অবস্থান শক্তিশালী এমন এলাকাতেও শরিকদের জন্য আসন ছাড় দেওয়া হচ্ছে। রংপুর বিভাগে ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও সমঝোতার স্বার্থে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন জানান, আলোচনা এগোচ্ছে এবং যেসব আসনে মতবিরোধ আছে, শীর্ষ বৈঠকে সেগুলোর নিষ্পত্তি হবে।
এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, জোটে দ্বিতীয় অবস্থান নিশ্চিত করতে তারা ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে বেশি আসন চেয়েছিল। তবে জোট সূত্র বলছে, তা সম্ভব হচ্ছে না। ইসলামী আন্দোলন শুরুতে ১৫০ আসন দাবি করলেও পরে ৭৫ আসনে নেমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত হাতপাখা প্রতীকে ৩৫টি আসন ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এনসিপি পেতে পারে ৩০টি আসন। এবি পার্টির ভাগে যেতে পারে তিন থেকে পাঁচটি আসন। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত পেতে পারে ১৫টি এবং ঘড়ি প্রতীকের খেলাফত পেতে পারে ১০টি আসন। এলডিপি ও লেবার পার্টি যুক্ত হলে অন্য শরিকদের আসন আরও কমতে পারে। এলডিপির জন্য তিনটি আসনের কথা বলা হচ্ছে।
বিএনপির সঙ্গে থাকা ১২ দলীয় জোট শেষ পর্যন্ত আসন না পাওয়ায় ভেঙে গেছে। এই জোটের দুটি দল বিএনপিতে বিলুপ্ত হয়েছে এবং বাকি দলগুলো এখন জামায়াতের জোটে যোগ দিয়েছে। জাতীয় পার্টি জাফরের মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন জানিয়েছেন, নিবন্ধন না থাকায় লেবার পার্টির প্রার্থীরা ওই দলের ব্যানারে নির্বাচন করবেন এবং জামায়াতের সমর্থন চাইবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করা নিয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তাদের মতে, এতে ‘বিতর্কিত’ কর্মকাণ্ডের দায় জোটকে নিতে হবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরকারপৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ তুলবে। তবে বৈঠকসূত্রে জানা গেছে, আসিফ মাহমুদ ঢাকা-১০ আসনে জোটের প্রার্থী হতে পারেন এবং জামায়াত তাকে সমর্থন দিতে পারে। মাহফুজ আলম অতীতে জামায়াতকে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করায় তাকে প্রার্থী করার বিষয়ে এখনও সম্মতি মেলেনি।
জোট না করার আহ্বান জানিয়ে ৩০ নেতার চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত ও শিবির বিভাজনমূলক রাজনীতি করেছে, গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়েছে এবং এনসিপির ওপর অপকর্মের দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এনসিপির ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের কথাও উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তাদের সঙ্গে জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থান দুর্বল করবে।
এর জবাবে ১০০ নেতার পাল্টা চিঠিতে বলা হয়, দলীয় ও জাতীয় স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে জোট গঠনের সিদ্ধান্তে তারা সম্পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন এবং নির্বাহী কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখছেন।