ইরানের বিরুদ্ধে টানা সামরিক চাপ, হামলা আর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিন মাসের সংঘাতের পর এখন ওয়াশিংটনজুড়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়ছেন কি না তিনি।
বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, সামরিক অভিযান চালিয়েও ইরানের পারমাণবিক অবস্থান, হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব কিংবা দেশটির ক্ষমতাকাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।
রোববার (২৫ মে) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে অনিশ্চিত আলোচনা, অন্যদিকে নতুন হামলার হুমকি, এই দুই অবস্থানের মধ্যে দোদুল্যমান রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগতভাবে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়নি। বরং তারা দেখিয়েছে, চাইলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলা বলেন, ‘তিন মাস পেরিয়ে গেছে। যে যুদ্ধটি ট্রাম্পের জন্য স্বল্পমেয়াদি সহজ বিজয় হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হচ্ছে।’
নির্বাচনী প্রচারণার সময় অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তার বৈদেশিক নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের অবস্থান ধরে রাখার চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ওলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়েও গেছে।’
তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক বিশ্লেষক। ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। কিন্তু এখনো দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। ধারণা করা হচ্ছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম এখনো ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পেইনকফ বলেন, ‘ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু তাদের শাসকদের কাছে শুধু টিকে থাকাটাই সাফল্য।’
একই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বও বাড়ছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। অনেক ইউরোপীয় দেশ এমন যুদ্ধে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যে বিষয়ে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক রবার্ট কাগান তার ‘চেকমেট ইন ইরান’ বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও বড় কৌশলগত ধাক্কায় রূপ নিতে পারে। তার ভাষায়, ‘আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন কোনো চূড়ান্ত মার্কিন বিজয়ও আসবে না, যা ইতোমধ্যে হয়ে যাওয়া ক্ষতির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে।’
এদিকে ইরান এখনো দাবি করে আসছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। ফলে সংঘাত থামলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সহজে কমবে না বলেই ধারণা কূটনৈতিক মহলের।