
ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনের পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে—এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছে তুরস্ক। আঙ্কারার দাবি, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে পুঁজি করে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের চেষ্টা করছে তেল আবিব।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক টেলিভিশন বক্তব্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, মোসাদ আর তাদের তৎপরতা আড়াল করছে না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা সরাসরি ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দিচ্ছে। যদিও সিরিয়া ও ইরাক ইস্যুতে তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আঙ্কারা ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
হাকান ফিদানের মূল্যায়নে, গত তিন দশক ধরে ইরান যে উচ্চাভিলাষী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতি অনুসরণ করেছে, বর্তমান সংকটে দেশটিকে মূলত সেই নীতিরই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এর ফলেই পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলমান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ বর্তমান প্রজন্মের সংবেদনশীল তরুণ সমাজ, যারা প্রতিনিয়ত কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। এই তরুণরা রাজপথে নেমে সরকারের প্রতি একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিচ্ছে। ফিদান আশা প্রকাশ করেন, তেহরান সরকার জনগণের এই ক্ষোভের ভাষা ও বার্তা যথাযথভাবে অনুধাবন করবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এবারের আন্দোলন ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিক্ষোভের তুলনায় আকারে ছোট। তার মতে, এই আন্দোলনের ফলে বর্তমান ইরান সরকারের পতন ঘটবে—এমন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, ১৯৯৯ সালের পর ইরানে এত বড় পরিসরের ও সংঘাতময় বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসইটিএ–র বিশ্লেষক মুস্তফা চানারের মতে, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা যত গভীরই হোক না কেন, ইরানের অখণ্ডতা রক্ষা করা তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব থেকে তুরস্কও মুক্ত থাকবে না।
সব মিলিয়ে তুরস্কের অবস্থান স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যে তারা কোনো নতুন গৃহযুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায় না। আঙ্কারা সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং মনে করছে, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন আন্দোলনটিকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে, যা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এমন সংকটময় সময়ে তুরস্কের এই বক্তব্য তেহরানের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও, তরুণ প্রজন্মের অর্থনৈতিক দাবি ও প্রত্যাশা পূরণ করা এখন ইরান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই