
দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সরকারের আয়ে বড় ধরনের টানাপোড়েন, অন্যদিকে অর্জিত রাজস্বের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় ও ঋণের সুদ মেটাতে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী জুন নাগাদ সরকারের অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে এখন বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ৩১৫ কোটি ডলার ঋণের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সরকার।
ঋণের জালে সরকার
চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাস পার হতেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পুরো বছরের জন্য ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য থাকলেও ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার নিয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই ঋণের একটি বড় অংশ (৩২,১৯৩ কোটি টাকা) কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সরবরাহ করেছে, যা কার্যত টাকা ছাপানোর সমান এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায়, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে বড় অংশ এবং বিদেশি ঋণ রয়েছে ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার।
রাজস্ব আদায়ে বড় ধস
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিইর) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর সংগ্রহ করতে পারছে না। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অথচ সরকারের মোট আয়ের ৮০ শতাংশই আসার কথা এনবিআর থেকে। এনবিআর-বহির্ভূত খাতেও আয়ের গতি অত্যন্ত মন্থর।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পাহাড়
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, অর্থবছরের শেষ চার মাসেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। বাজেটে এই খাতে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও স্থানীয় বাজারে সমন্বয় না করায় ভর্তুকির চাপ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, "অনেক আগ থেকেই সরকার চাপে রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই চাপকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর্থিক চাপ সামলানোর প্রধান দুটি উপায় হলো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমানো। রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে অবশ্যই কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। কর প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আলাদা করতেই হবে। তা না করে স্বার্থের দ্বন্দ্বের সুযোগ রেখে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে কর অব্যাহতির সুযোগ কমাতে হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "জ্বালানি তেলের দর প্রতি মাসে সমন্বয় করার কথা। অথচ এপ্রিলে এসে দেখা গেল সরকার সমন্বয় না করে আগের দরই রেখে দিল। পার্শ্ববর্তী ভারতসহ সব দেশ জ্বালানির দর বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে না বাড়ানোর ফলে অনেক জ্বালানি ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া কোনো সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগও নেই। কেননা, বৈশ্বিক বাজারে সব ধরনের পণ্যের পাশাপাশি পরিবহনসহ অন্য সব খরচ বাড়ছে।"
ডলার ও রিজার্ভের বর্তমান চিত্র
রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের তারল্য রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত এক মাস বাজার থেকে ডলার কেনেনি। বর্তমানে ডলারের দর ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় স্থিতিশীল আছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.৪৭ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দ্বারস্থ সরকার
জরুরি ৩১৫ কোটি ডলার সংস্থানের জন্য আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছে বাজেট সহায়তার আবেদন করেছে সরকার। তবে আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড়ের আগে ভর্তুকি কমানো এবং সংস্কারের কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে। আজ শুক্রবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি দল ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যেখানে দ্রুত অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানানো হবে।
ব্যয় সংকোচনে কঠোর পদক্ষেপ
আর্থিক চাপ সামলাতে সরকার এরই মধ্যে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। গাড়ি কেনা ও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ এ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, "বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে গেছে। তাই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এখন স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয়ী হতে হবে। এ জন্য পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয়ের আওতায় অনেক প্রকল্পে অযৌক্তিক ব্যয় করা হয়, এগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। জ্বালানি খাতের বাড়তি চাহিদার জন্য বহুজাতিক সংস্থা থেকে অর্থায়ন পেতে জোর চেষ্টা চালাতে হবে।"