
দেশের টেকসই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতে এতদিন খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বর্তমান চিত্র চরম উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—ভুয়া ও বেনামি ঋণ বিতরণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকি এবং বকেয়া ঋণের পাহাড় জমার কারণেই কৃষি খাতে এই চরম আর্থিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি খাতের এই বিপুল অংকের বকেয়া ও খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে কৃষি ঋণ বিতরণের মোট পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে; যদিও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো বেশ কম। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব ব্যাংককে অবিলম্বে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের গতি বাড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকগুলো থেকে কৃষি খাতের নামে দেদারসে বেনামি ও ভুয়া ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া সেসব ঋণের টাকা এখন আর ব্যাংকে ফেরত আসছে না এবং তা পর্যায়ক্রমে খেলাপি ঋণে রূপান্তরিত হচ্ছে। মূলত বিগত আমলের আর্থিক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার নেতিবাচক প্রভাবই এখন দেশের কৃষি খাতকে গ্রাস করছে।
ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি ঋণের খতিয়ান: শীর্ষে বিশেষায়িত ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসেরভিত্তিক তথ্যে দেখা যায় যে কৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর (যেমন: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক)। বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
বিশেষায়িত ব্যাংক: গত বছরের মার্চে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা, চলতি বছরের মার্চে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বৃদ্ধির হার ২৯৫ শতাংশেরও বেশি।
ইসলামী ব্যাংকসমূহ: খেলাপি ঋণ বাড়ার দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। গত বছরের মার্চে তাদের খেলাপি ছিল ২৭৫ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চে বেড়ে হয়েছে ৮৮৮ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ২২৩%)।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: সরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৬ কোটি টাকায় (বৃদ্ধির হার ২২০%)।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক: বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কিছুটা কম। গত বছরের মার্চে এসব ব্যাংকে খেলাপি ছিল ৫৯০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চে ৭২০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে (বৃদ্ধির হার ২২%)।
বকেয়া ঋণের পাহাড়: আগামী দিনের বড় শঙ্কা
প্রতিবেদনের আরও একটি আশঙ্কাজনক দিক হলো, খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি বকেয়া (ওভারডিউ) ঋণের পরিমাণও হু হু করে বাড়ছে। এসব বকেয়া ঋণ যদি কৃষকেরা বা ঋণগ্রহীতারা দ্রুত পরিশোধ না করেন, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলোও চূড়ান্ত খেলাপির তালিকায় যুক্ত হবে।
তথ্যানুযায়ী, গত বছরের মার্চে এমন বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৭ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চে ১২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকায়। বরাবরের মতোই কৃষি ঋণ বিতরণে এগিয়ে থাকা বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেই এই বকেয়া ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি। ফলে আগামী দিনগুলোতে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বড় হওয়ার স্পষ্ট আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যদিও একই সময়ে এই খাতে ঋণ আদায়ের হার ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তার বিপরীতে 'আদায়যোগ্য অথচ আদায় হয়নি'—এমন ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। ফলে এই বিশাল অংকের অনুৎপাদনশীল ঋণও এখন খেলাপির খাড়ায় পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।