
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বাস্তবতাভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার—এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অর্থনীতি বিভাগকে সহায়তা দিতে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘অতীতে প্রণীত পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার যে বড় ধরনের অমিল ছিল, তা এখন মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, যা বাস্তবায়নযোগ্য এবং জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
তিতুমীর জোর দিয়ে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে এখন সময়োপযোগী ও ভবিষ্যৎমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘অতীতের মতো কেবল সংখ্যাভিত্তিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বর্তমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করা হবে। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।’
অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যেন সবার অংশগ্রহণ ও প্রয়োজনের প্রতিফলন ঘটে। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।’
খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের উত্তোলন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘কার্যকর অর্থনৈতিক কৌশল সেটিই, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় প্রণীত। কিন্তু অতীতে অনেক পরিকল্পনাই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ও কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল।’
নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, ‘জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট ও ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখন জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবসম্মত কর্মকৌশলে রূপান্তর এবং কার্যকর বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণই এখন প্রধান কাজ।’
শিল্পায়ন ও অর্থনীতির বহুমুখীকরণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে শিল্প খাতে নতুনভাবে ভাবতে হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং শিল্পের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী শিল্প উৎপাদন কমেছে, যা উদ্বেগজনক।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই দুই খাতে বৈষম্য ও গুণগত মানের ঘাটতি বড় সমস্যা। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে পড়ার দক্ষতা ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সের অবনতি গভীর সংকেত দিচ্ছে। বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যেও একটি চাপগ্রস্ত অর্থনীতি নিয়ে এগোতে হচ্ছে দেশকে।’
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড চালুর মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার।’
কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রবৃদ্ধির চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যে প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অনেকাংশেই কর্মসংস্থানবিহীন ছিল এবং এর তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
তিনি জানান, বর্তমানে যুব, নারী ও বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তবে বাজার এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকবে। নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে সরকারের কার্যকারিতা সহজে মূল্যায়ন করা যাবে।