
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশেও এ বিষয়ে নীতি ও বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ এখন বিশ্বজুড়ে একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হয়ে উঠেছে।
‘অ্যাডোলেসেন্স’-এ অনলাইনের অন্ধকার জগতের চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝাতে নেটফ্লিক্সের ‘অ্যাডোলেসেন্স’ সিরিজের উদাহরণও দিয়েছেন আসিফ সালেহ।
তিনি লিখেছেন, সিরিজটিতে ১৩ বছর বয়সী জেমির গল্প তুলে ধরা হয়েছে। নিজের ঘরে বসেই কীভাবে সে অনলাইনের একটি অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হয়, সেটিই সেখানে দেখানো হয়েছে।
আসিফ সালেহের ভাষায়, জেমির বাবা-মা বুঝতেই পারেননি কখন তাদের সন্তান স্ক্রিনের ভেতরের সেই জগতের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
তার পোস্টে বলা হয়, অ্যালগরিদম, ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ নামে পরিচিত বিষাক্ত অনলাইন সংস্কৃতি, একাকীত্ব এবং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এই সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি কোনো একটি দেশ বা পরিবারের আলাদা গল্প নয়। বরং বর্তমান সময়ে এটি অনেক পরিবারের সম্ভাব্য বাস্তবতা।
সরকারগুলো কেন এত দেরিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে
আসিফ সালেহের মতে, শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারগুলো দীর্ঘ সময় পিছিয়ে ছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি তাদের অ্যালগরিদমও ক্রমেই আরও আসক্তিকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিতে সরকারগুলোর অনেক সময় লেগেছে।
তিনি লিখেছেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা, ‘অ্যাডোলেসেন্স’-এর মতো গল্প এবং বিভিন্ন আইনি উদ্যোগ—সব মিলিয়ে সরকারগুলোর ওপর নীতি পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের ওপর বিধিনিষেধ
নিজের পোস্টে আসিফ সালেহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট, রেডিট, এক্স ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, কানাডা, ডেনমার্ক ও ফ্রান্সেও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে অথবা এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তার পোস্টে বলা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আসিফ সালেহ।
তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাজারগুলোর একটি।
তার পোস্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ। অন্যদিকে টিকটক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি থেকে ৪ কোটি ৬০ লাখ।
আসিফ সালেহের বক্তব্য, যেসব দেশে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নতুন আইন বা বিধিনিষেধ চালু করা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর আকার এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে শিশু-কিশোরদের অনলাইন ঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
‘বাংলাদেশ কবে আলোচনা শুরু করবে?’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে আইন ও নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এ বিষয়ে কবে আলোচনা শুরু করবে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন আসিফ সালেহ।
তার পোস্টের শেষদিকে তিনি বলেন, সন্তানকে ফোন দেওয়া আর সেই ফোনের ভেতরে থাকা তার অনলাইন জগত সম্পর্কে সচেতন থাকা—দুটি এক বিষয় নয়।
বিশ্ব যখন এ বিষয়ে নীতি পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও এ নিয়ে আলোচনা শুরু করার সময় এসেছে।