
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘিরে আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ঘিরে। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল প্রকাশ এবং ইতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়ার পরও বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। একই দিনে ঋণখেলাপির ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিতে মেটার পাঁচ বছর মেয়াদি ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপের (সিডিএস) ব্যয়ও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এআই খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো এবং অর্থ সংগ্রহে নতুন ধরনের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চলতি বছরের মূলধনি ব্যয়ের পূর্বাভাসের নিম্নসীমা ৫ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে মেটা। এতে এ খাতে কোম্পানিটির সম্ভাব্য মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৬ লাখ ৫৮ হাজার কোটি থেকে ১৭ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮০ পয়সা ধরে এ হিসাব করা হয়েছে।
এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করবে প্রতিষ্ঠানটি। ‘মিউজ’ (Muse) এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে মেটার। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কোড লেখা ও বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করার ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও প্রযুক্তিটিকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য লাভজনক পণ্যে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে কোম্পানিটি।
এআই খাতে বিনিয়োগের অর্থ জোগাতে ‘ক্লাস সি’ নামে নতুন ধরনের ভোটাধিকারহীন শেয়ার চালুর পরিকল্পনা করেছে মেটা। কোম্পানির নথি অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে এসব শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে শত শত বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ অর্থ এআই খাতে বিনিয়োগ, অধিগ্রহণ এবং কর্মীদের পারিশ্রমিক দিতে ব্যবহার করা হবে। ২০২৬ সালের শরৎকাল থেকেই শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
মেটার মতে, নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। কারণ, অতিরিক্ত ঋণ কোম্পানির ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রেকর্ড উচ্চতায় সিডিএস ব্যয়
মেটার আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে সিডিএস বাজারেও। বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির পাঁচ বছর মেয়াদি সিডিএসের স্প্রেড বেড়ে ১১৪ দশমিক ৭৯ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ।
সিডিএস এক ধরনের আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী বা ঋণদাতারা কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিতে পারেন। এ সুরক্ষার ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণঝুঁকি নিয়ে বাজারের উদ্বেগ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে সিডিএসের ব্যয় বৃদ্ধি মানেই কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হতে যাচ্ছে, এমন নয়।
ফিউচারাম ইকুইটিজের প্রধান বাজার কৌশলবিদ শে বোলুরের মতে, সিডিএসের ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মেটার প্রকৃত ঋণখেলাপির ঝুঁকির পাশাপাশি এআই খাতে বিপুল অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও ভূমিকা রাখতে পারে।
এআই বিনিয়োগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। ডেটা সেন্টারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোরউইভ ও নেবিয়াসের শেয়ারেও চলতি মাসে চাপ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআই সেবার চাহিদা হঠাৎ কমে গেলে বিপুল ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। এ ছাড়া এআই চিপের মতো প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে অবমূল্যায়িত হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবারের লেনদেন শেষে চলতি বছরে মেটার শেয়ারের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। তবে বৃহস্পতিবারের দরপতনের ফলে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
এআই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি অর্থায়ন ও ঋণঝুঁকি সামলানোও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।