
বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত অবস্থান থেকে সরে এসেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশন, মহাদেশীয় সংস্থা এবং টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকির পর পরিকল্পনাটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত করার লক্ষ্য আমাদের সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। সবার মতামত শোনার পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, এই প্রস্তাব এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে যা আমাদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলে না।’
এর আগে গত মঙ্গলবার ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল। প্রায় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার মূল্যমান নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বিভিন্ন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানটির অধীনে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো ফিফার সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হতো। ফিফা জানিয়েছিল, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালের শুরুতে সংস্থার ২১১টি সদস্যদেশ এককালীন ২ কোটি ডলার করে পাবে। পাশাপাশি ২০২৭-৩০ মেয়াদে বার্ষিক উন্নয়ন অনুদান ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ ঘোষণা আসার পরপরই বিশ্ব ফুটবলের প্রভাবশালী মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সরাসরি টুর্নামেন্ট বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, ‘এই প্রস্তাব বহাল থাকা পর্যন্ত উয়েফাভুক্ত কোনো জাতীয় দল ফিফার টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না।’
আরেক বিবৃতিতে উয়েফা বলে, ‘বিশ্বকাপকে কেবল একটি বাণিজ্যিক বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।’
পরবর্তীতে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনক্যাকাফও উয়েফার অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়। ৪৭ সদস্যের এএফসি এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলে, ‘ফিফা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো বিষয় এখন প্রকাশ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে। ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের প্রত্যেকের জন্যই এটি গভীর উদ্বেগের।’
এদিকে, ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল সংস্থা কনমেবলের সভাপতি আলেহান্দ্রো দমিনগুয়েসও প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ফিফার কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার পাশাপাশি ফিফার ভেতরেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। শুক্রবার ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের সময় তিনি এই উদ্যোগকে ‘ফিফা এবং ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের জন্য একটি ক্ষতিকর প্রস্তাব’ বলে মন্তব্য করেন।
একই দিনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও ইনফান্তিনোর কড়া সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা পরিচালনার জন্য তিনি ‘ভুল ব্যক্তি’।
সবদিক থেকে চাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ফুটবলে ঐক্য ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ফিফা সভাপতি। ইনফান্তিনো বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে ফুটবল সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার এক টেবিলে আনাই আমার মূল লক্ষ্য। সবার যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে- বিশেষ করে যাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য প্রয়োজন- সেই দেশগুলোতে ফুটবলের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাব।’