
রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আর অনিশ্চয়তার পাহাড় ডিঙিয়েও বেগম খালেদা জিয়াকে থামানো যায়নি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিকূল সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৃঢ় ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক স্মরণসভায় এভাবেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংগ্রামী ভূমিকার কথা তুলে ধরেন বক্তারা।
সোমবার ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শতবর্ষী ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তব্য দেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এহতেশামুল হক। তিনি বলেন, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ধারাবাহিক রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়াকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
এহতেশামুল হক তার বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই সন্তানসহ বন্দি হওয়া, স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত এবং পরবর্তী সময়ে সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মোকাবিলা করার পরও খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্মরণসভায় আরও বক্তব্য রাখেন ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত ১১৯তম প্রেসিডেন্ট মার্ক শেফ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাবেক সম্পাদক ম্যারন বিলকাইন্ড, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা ও মার্শা বার্নিকাট, স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো স্টিভ রোজ, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরী এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা।
স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, “আমরা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করছি তা নয়, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রটেক্টর এবং অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা। যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিরোধী মতের কণ্ঠ রুদ্ধ, তখন তিনি নির্ভীক চিত্তে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বে নজির সৃষ্টিকারী এক অনন্য নেতা।”
তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার সাহসের উৎস ছিল ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সরানোর উদ্যোগে তিনি বাধা দেন এবং স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র সরানো যাবে না বলে দৃঢ় অবস্থান নেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
রাষ্ট্রদূত মুশফিক বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি রাখা হয়েছে। এসব হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে প্রতিবাদ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে একে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, “বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন তার লিগ্যাসি স্মরণে রাখবে মানুষ।” তিনি উল্লেখ করেন, বহু নির্যাতন সহ্য করলেও খালেদা জিয়া কখনও অভিযোগ করেননি। সকালের নাস্তা থেকে রমজানের ইফতার পর্যন্ত তার অতিথিপরায়ণতা সবাইকে মুগ্ধ করত। মার্শা বার্নিকাট বলেন, “খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। খুব বিপদ এবং সংকটের মধ্যেও তিনি ছিলেন হাস্যেজ্জ্বল এবং আন্তরিক। খালেদা জিয়া ছিলেন খুবই অমায়িক প্রকৃতির মানুষ। তিনি বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন।” একজন নারী হিসেবে তার নেতৃত্ব এশিয়া উপমহাদেশে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ড্যান মোজেনা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া অন্যকে সম্মান দিয়ে নিজেও সম্মানিত হতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন্যদের খোঁজখবর নিতেন। গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে তার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে খালেদা জিয়া সবসময় তার সঙ্গে আন্তরিক ছিলেন এবং প্রয়োজন হলে কথা বলার সুযোগ দিতেন।
তিনি আরও বলেন, “আপনি এখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের কিংবদন্তি খালেদা জিয়াকে স্মরণ করার জন্য সবাইকে একত্রিত করায় আপনাকে ধন্যবাদ জানচ্ছি।” তার মতে, বিরোধীদলে থেকেও খালেদা জিয়া সবার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করে রেখেছিলেন এবং সাক্ষাৎ চাইলে সময় দিতেন। অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়েও তিনি সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এবং কখনও প্রশ্ন তোলেননি কেন তাকে এই নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মোজেনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে সম্মানের সঙ্গে তাকে চিরবিদায় জানিয়েছে, তা তাকে অভিভূত করেছে।
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মার্ক শেফ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চ্যাম্পিয়নের স্মরণসভা আয়োজন করতে পেরে তারা গর্বিত। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতির হাল ধরতে বাধ্য হন। সমর্থকদের চাপে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়া পরিবার সবচেয়ে জনপ্রিয় অবস্থানে পৌঁছেছে। গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।
ম্যারন বিলকাইন্ড বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জীবন প্রমাণ করে গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়; একে রক্ষা করতে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়। তার ভাষায়, ক্ষমতাসীনরাই সবসময় ইতিহাস গড়ে না, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস ও ধৈর্য নিয়ে যারা লড়াই করেন তারাই ইতিহাসের নায়ক হয়ে থাকেন।
আলোচনা শুরুর আগে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যা উপস্থিত অতিথিদের গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে।
ওয়াশিংটনের এই স্মরণসভা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্রের এই নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে ওঠে, যা আবারও প্রমাণ করে বিশ্বমঞ্চে বেগম খালেদা জিয়ার নাম আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও মর্যাদার।