
নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্যদের বেলায় জামায়াতে ইসলামী একই নীতি মানতে চায় না বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। পিরোজপুরে এক মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন করেছেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ই যারা কাউকে তাঁর নিজের বসতভিটায় সমাহিত হতে বাধা দেন, রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে তাঁরা কী করবেন?
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তাসনিম জারা।
পোস্টে তিনি জানান, গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী মারা যান। তিনি সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে তাঁর মরদেহ দাফন করা নিয়ে স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা বাধা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ করেছেন তাসনিম জারা।
দাফন নিয়ে বাধা, পরিবারের সদস্যদেরই খুঁড়তে হয় কবর
মৃত ব্যক্তির দাফনে সামাজিকভাবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের রীতির কথা তুলে ধরে তাসনিম জারা লেখেন, ‘আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।’
তাঁর অভিযোগ, মানিক পশারীর মৃত্যুর পর স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মিছিল করেন। মাইক ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে জানানো হয়, তাঁকে পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এতে মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সারাদিন উদ্বেগের মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়।
মৃতের মেয়ে সীমু আক্তারের বক্তব্য উল্লেখ করে তাসনিম জারা জানান, প্রথমে বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন এসে সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেন। পরে সীমু আক্তার তাঁর ফুফুদের সঙ্গে নিয়ে আবার কবর খোঁড়েন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় অন্য কেউ কবর খুঁড়তে এগিয়ে আসেননি।
এ প্রসঙ্গে তাসনিম জারা লেখেন, ‘যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।’
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশি পাহারায় পরিবারের সদস্যদের খোঁড়া কবরে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বাইরে পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে আরও অভিযোগ করেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেছিলেন। ওই নেতার বক্তব্য ছিল, তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া যাবে না। তবে দাফনের পর একই নেতা দাবি করেন, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা লাশ নিয়ে রাজনীতি করেন না।
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে আপত্তি থাকলে তা যাচাই করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। তিনি লেখেন, ‘মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে।’
তাঁর বক্তব্য, কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও দাফন আটকে দিয়ে বা মাইকে ঘোষণা প্রচার করে সেই বিরোধের নিষ্পত্তি করা যায় না।
মৃত ব্যক্তির প্রতি সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, সাধারণত জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা তাঁর ভুলত্রুটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু পিরোজপুরের ঘটনায় মানিক পশারীর পরিবার সেই সুযোগও পায়নি। এমনকি তাঁর নিজের গ্রামেও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
‘পিরোজপুরের মাটির দলিল কি তাঁদের নামে?’
জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করে তাসনিম জারা লেখেন, ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না’—এমন কথা বলার মধ্য দিয়ে দলটির নেতা-কর্মীরা এমন আচরণ করেছেন, যেন ওই এলাকার জমির মালিকানা তাঁদেরই। তাঁর ভাষায়, একজন ব্যক্তি নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও যেন তাঁদের হাতে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। তাসনিম জারার বক্তব্য, দল হিসেবে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। অথচ এখন দলটির নেতা-কর্মীরা কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন এবং কার কবর কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করতে চাইছেন।
তাসনিম জারা আরও বলেন, একসময় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার স্লোগান দেওয়া হতো। এমন বক্তব্য কতটা অন্যায়, তা তাঁদের বোঝার কথা। কিন্তু বিরোধী দলে থাকা অবস্থাতেই তাঁরা সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
পোস্টের শেষাংশে জামায়াতের ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাসনিম জারা লেখেন, ‘নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সঙ্গে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ করেন। বিরোধীদলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’