
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের দিকে তিনি এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তবে দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যার শিকার হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে ফিরতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতে আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’
২০২৪ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। পরে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে তিনি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি বিচারব্যবস্থা কী ধরনের আচরণ করে, সেটিও স্পষ্ট হবে।
তিনি জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে দেশে ফিরবেন। তাদের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তবে ঠিক কবে দেশে ফিরবেন, কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন কিংবা নির্দিষ্ট তারিখ কী হবে—সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিয়ে আমাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করছে। কিন্তু আমি নিজেই দেশে ফিরব।’
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিচার এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়,’
শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই তিনি তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই ফিরে আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’
তিনি বলেন, কারাবাস নিয়ে তার কোনো উদ্বেগ নেই। অতীতেও একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তাকে কয়েকবার আটক করা হয়েছিল। পরে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হন। পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন।
২০২৪ সালে দেশ ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তার বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসছিল এবং তখন তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর হুমকি তৈরি হয়েছিল।
সরকার পরিচালনা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতে পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’
তিনি জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টিতে অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়ে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? যদি আমরা খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সেই রায় জনগণই দিক।’