
দীর্ঘ ৬০ দিন কারাবরণ শেষে মুক্তি পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কারাজীবনের দুঃসহ স্মৃতি ও পারিবারিক সংকটের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি।
শুক্রবার (৮ মে) ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, জেলখানায় থাকাকালীন প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং পরিবারের ওপর নেমে আসা নানামুখী চাপের কথা।
শেষ দেখা হয়নি দাদার সাথে
ইমি তাঁর লেখায় কারান্তরালে থাকা অবস্থায় আপনজনকে হারানোর এক হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। গত ২৫ মার্চ তাঁর প্রিয় ‘ছোট দাদা’ মারা যান। ইমি লিখেছেন:
"ছোট দাদার সাথে আমার আর কখনো কথা হবে না। দাদা ২৫ মার্চ রাতে সারাজীবনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আমার জেলখানার রুট দিয়েই দাদার লাশ যায় দাফনের উদ্দেশ্যে। আমি জেল সুপারের পা দুইটা ধরতে জাস্ট বাকি রেখেছিলাম, যাতে শেষ বারের মতো একটাবার দাদাকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। আমাকে উত্তরে বলা হয় ভাসুরের লাশ দেখা তো ভালো না। ভাসুরকে দেখার জন্য এত উদগ্রীব হচ্ছেন কেন? ক্ষোভে, ঘৃণায় আমার দম আটকে আসবার উপক্রম হয়। আমার আর বলা হয় না যে আমি ভাসুর না, আমার নিজের ভাই হারিয়েছি।"
পারিবারিক সংকট ও বাবার অসুস্থতা
কারাগারে থাকাকালীন ইমির পরিবারও চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি জানান, তাঁর জামিন নামঞ্জুর হওয়ার খবর শুনে বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এছাড়া তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বামী একাই সব প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলেছেন। এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁদের বাড়ি তিনবার ভাঙচুর করার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
জমি দখল ও মানসিক ট্রমা
রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের বর্ণনা দিয়ে ইমি তাঁর স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন:
"৫ আগস্টের পরে তিন, তিনবার আমাদের বাড়ি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। স্বাধীনতাবিরোধীদের ব্যাকাপে থাকা এক মহিলা অবৈধভাবে আমাদের জমি দখল করে বসে আছে। এতকিছুর পরও আমার আব্বু এতটুকু টলে নি। একটা সন্তানের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কি কিছু হতে পারে? অথচ আমি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। অনেক মানুষের ভালোবাসা, দোয়া পেয়েছি, পাচ্ছি। সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্ত যে চরম মূল্য আমাকে দিতে হলো- এতটা ক্ষত, এতটা ট্রমা কি আসলেই আমার প্রাপ্য ছিল..?"
দীর্ঘ দুই মাস পর কারামুক্ত হয়ে ইমির এই আবেগঘন বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন স্বজন হারানোর আজীবন আক্ষেপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বৈরিতার মুখে পরিবারের টিকে থাকার লড়াই—সব মিলিয়ে ইমির এই জবানবন্দি এক কঠিন বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।