
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে গভীর সংকটে পড়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ছে হতাশা ও উদ্বেগ। মাঠপর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিদেশে অবস্থান করে দল পরিচালনা করা আর বাস্তবসম্মত নয়—দল টিকিয়ে রাখতে শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়েও দেশে ফিরতে হবে।
দলটির তৃণমূলের অনেকেই আগে মনে করতেন, নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারে এলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে এবং তারা আবার এলাকায় ফিরে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন। ঢাকার বাইরের এক উপজেলার আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মনে করেছিলাম বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমরা হয়তো একটু এলাকায় ফেরার সুযোগ পাবো। সাংগঠনিক কার্যক্রমও হয়তো ধীরে ধীরে শুরু হবে। আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞাও থাকবে না। কিন্তু এখন যেটা হলো, এটা আমরা আশা করি নাই। অবস্থা আগের মতোই।’
এই প্রত্যাশার পেছনে দুটি কারণ কাজ করেছিল বলে জানিয়েছেন তৃণমূল নেতারা। প্রথমত, বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল তারা কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পেতে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি কিছুটা নমনীয় আচরণ করেছিল।
আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসলে হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে—এমন আশা থেকেই আমরা সাধারণ ভোটারদের বিএনপিকে ভোট দিতে বলেছিলাম। কিন্তু ভোটের পর বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে গেছে।’
শীর্ষ নেতাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম।
নির্বাচনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে খুলনাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে দলীয় কার্যালয় খোলার কিছু স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ দেখা যায়। খুলনার হাদিস পার্কে অবস্থিত কার্যালয়ে প্রবেশ করে কর্মীরা শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে ফুল দেন। তবে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে কার্যালয়টি আবারও হামলার মুখে পড়ে। বর্তমানে বেশিরভাগ কার্যালয় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় নেতারা বলছেন, আপাতত আত্মগোপনে থেকেই সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাই তাদের প্রধান কাজ।
তৃণমূলের এক নেতা জানান, এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে যাতায়াত বা ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন বাধা না থাকলেও রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করতে গেলেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের নামে মামলা রয়েছে বা যারা পদধারী নেতা, তাদের জন্য এলাকায় ফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
তৃণমূলের চাপ ও কেন্দ্রের অবস্থান
মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্ব সামনে না থাকলে কর্মীদের সক্রিয় রাখা কঠিন। আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানী শহর ঢাকা দখল করতে না পারলে তৃণমূল দখল করে লাভ নাই। আর ঢাকা দখল করতে গেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব লাগবে। নেতৃবৃন্দের এখন দেশে ফিরে আসা উচিত এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হলেও আসা উচিত।’
তবে এই চাপের বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বলছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, ‘নেতাদের ভেতরে দেশের বাইরে অনেকেই আছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাইরে বসে আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করা হচ্ছে। নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশের ভেতরে থেকেই আন্দোলন করছে।’
জাতীয় সংসদে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত আইন পাস এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদে যে আইনটি পাস করা হলো, তারপর কি দেশে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর রাজনীতি করা বা কথা বলার সুযোগ আছে? যদি সুযোগ থাকে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন কোনো নেতা বিদেশে বা আত্মগোপনে থাকবে না।’
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের প্রত্যাশিত অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন আইন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং চলমান ঝুঁকি—সব মিলিয়ে দলটির সংকট কাটার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। তৃণমূলের পক্ষ থেকে শীর্ষ নেতাদের দেশে ফেরার আহ্বান জানানো হলেও, বিদ্যমান আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আপাতত অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা