
মনোনয়ন পেয়েও স্থানীয় বিএনপির সমর্থন না পেয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানালেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর।
গলাচিপা ও দশমিনা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থাকলেও নুরকে ঘিরে প্রত্যাশিত ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। বরং এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীদের বড় অংশ কাজ করছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদ্য সাবেক সদস্য হাসান মামুনের পক্ষে। এই অবস্থায় নির্বাচনি সমীকরণে ক্রমশ সুবিধাজনক জায়গায় চলে যাচ্ছেন হাসান মামুন।
এই আসনে বিএনপির দুর্বলতার ইতিহাস পুরোনো। নব্বইয়ের পর দীর্ঘ সময় ধানের শীষ এখানে সাফল্য পায়নি এবং এলাকাটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুনের নিয়মিত যাতায়াত এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় বিএনপির অবস্থান ধীরে ধীরে শক্ত হয়। বিএনপি নেতা শাহজাহান খানের মৃত্যুর পর স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও বাড়ে। পাঁচ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তিনি কার্যত স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন তার হাতেই যাবে এই প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন নেতাকর্মীরা। শুরুতে একমাত্র মনোনয়নপ্রার্থীও ছিলেন তিনি।
কিন্তু ভিপি নুরের আগমনে হঠাৎ বদলে যায় রাজনৈতিক চিত্র। গলাচিপার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বাসিন্দা নুর বিএনপি জোটের মনোনয়ন চান। স্থানীয় পর্যায়ে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে বিএনপি আসনটি ছেড়ে দেয় তাকে। দলীয় প্রতীক ট্রাক নিয়ে নির্বাচনে নামেন নুর।
এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ ছিলেন হাসান মামুন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং প্রয়োজনে দলীয় পদ ছাড়ার কথাও জানান। গত ২৮ ডিসেম্বর তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দেন। পরদিন ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ৩০ ডিসেম্বর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। বহিষ্কারের পরও মাঠ ছাড়েননি তিনি। গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার অধিকাংশ পদধারী বিএনপি নেতা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও প্রকাশ্যে তার সঙ্গে রয়েছেন।
এই বাস্তবতায় নুর একাধিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির সমর্থন থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে যারা সহযোগিতা করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তার অনুসারীদের দাবি, বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
যুগান্তরকে নুরুল হক নুর বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনে যারা একসাথে ছিলাম তাদের মাত্র ১২টি আসন ছেড়েছে বিএনপি। যতদূর জানি মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া কোনো আসনেই স্থানীয় বিএনপির পূর্ণ সহযোগিতা পাচ্ছে না জোট কিংবা সমমনা দলের প্রার্থীরা। আমার এখানে একান্ত নিজস্ব লোকজন দিয়ে সব কমিটি করেছেন হাসান মামুন। এরা দলের চেয়ে হাসান মামুনকে বেশি আপন মনে করেন। দলীয় সিদ্ধান্তের চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হাসান মামুনের সিদ্ধান্ত। যে কারণে কেন্দ্র বলা সত্ত্বেও তারা আমার পক্ষে কাজ করছে না। বিষয়টি আমি বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছি। দুই উপজেলা বিএনপির সাবেক নেতা যারা আছেন তারা কিন্তু আমাকে ঠিকই সমর্থন দিচ্ছেন। বর্তমান নেতারা করছেন বিরোধিতা। এই সমস্যার সমাধান বিএনপিকেই করতে হবে। নয়তো বিএনপির প্রতি আস্থা হারাবে মিত্ররা। ভবিষ্যতে একসাথে পথচলার ক্ষেত্রে তৈরি হবে জটিলতা। আমার অবস্থান থেকে সার্বিক পরিস্থিতি জানানো হয়েছে বিএনপিকে। এখন তারা কী ব্যবস্থা নেয় সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি।’
তবে নুরের এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না স্থানীয় বিএনপির নেতারা। তারা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, যে পরিস্থিতিই আসুক, তারা হাসান মামুনের পাশেই থাকবেন।
চরবিশ্বাস ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাকের বিশ্বাস বলেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক হাসান মামুনের সাথে আছি। এই ইউনিয়নেও ভিপি নুরের তুলনায় হাসান মামুন বেশি ভোট পাবেন।’
গলাচিপা পৌর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘জোট-মোট বুঝি না, আমরা গলাচিপাবাসী বুঝি হাসান মামুন। ৩৬ বছর ধরে তিনি এখানে মাঠ-ঘাট চষে দলকে শক্তিশালী করেছেন। তাকে ছেড়ে গেলে বেঈমানি করা হবে। তাছাড়া আমরা তো ধানের শীষের বিপক্ষে না, ট্রাকের বিপক্ষে।’
গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘অন্য দলের লোক এনে এমপি বানালে কী হয় তার খেসারত আমরা এর আগে দিয়েছি। ২০১৮ সালে গোলাম মাওলা রনিকে ধরে এনে এখানে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। ফলাফল গত ৭ বছরে আমরা এলাকায় তার চেহারাও আর দেখিনি। সবকিছু বুঝে শুনে হাসান মামুনের পক্ষে নেমেছি। দল যে ব্যবস্থাই নিক, শেষ পর্যন্ত হাসান মামুনের পক্ষে থাকব।’
দশমিনা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম বলেন, ‘সুখে দুঃখে যে হাসান মামুনকে কাছে পেয়েছি তাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। নুরের পক্ষে কাজ না করলে দল থেকে যদি বহিষ্কার হতে হয় হব। কিন্তু তার আগে দলকেও ভাবতে হবে, কতজনকে বহিষ্কার করবে। নির্বাচনি এলাকার দুই উপজেলা বিএনপির সকল নেতা-কর্মী হাসান মামুনের পক্ষে। বহিষ্কার করলে তো হাজার হাজার জনকে করতে হবে। এখন কেন্দ্র যদি মনে করে যে এই দুই উপজেলায় বিএনপির কাউকে লাগবে না তাহলে তারা সবাইকে বহিষ্কার করুক। তারপরও আমরা হাসান মামুনের পক্ষে আছি এবং থাকবো।’
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম শানু বলেন, ‘এই জনপদ হাসান মামুনের জনপদ। একদিকে যেমন ভিপি নুর আমাদের দলের নয়, তেমনি বিএনপির সমর্থন আনলেও তিনি তো ধানের শীষ নিয়ে আসেননি।’
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির তৃণমূলের সমর্থন ছাড়া নুরের পক্ষে জয় কঠিন হবে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক শাহ আলম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আবু বক্করও গলাচিপা উপজেলার ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলছেন। নুরের বাড়িও এই উপজেলায় হওয়ায় এখানে ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিপরীতে দশমিনা উপজেলায় একমাত্র শক্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন হাসান মামুন। সবকিছু মিলিয়ে ভোটের অঙ্কে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থী।